বাংলাদেশের গভীর নদীসমূহের মধ্যে পশুর নদী অন্যতম । এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বাগেরহাট জেলার একটি নদী। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী নদীটির দৈর্ঘ্য ১০৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১১৬৪ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। এটি গঙ্গা জলপ্রবাহের একটি ধারা। যা সুন্দরবনের ভিতরে শিবসা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। নদীটি খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নে প্রবাহমান কাজিবাছা নদী হতে শুরু হয়েছে। এক সময় খুলনার রুপসা নদী পশুর নদীর সাথে সংযুক্ত হয়েছে। পশুর নদীর উপর দিয়ে মোংলা বন্দরে দেশী-বিদেশী জাহাজ যাতায়াত করে। এই নদী জোয়ার-ভাটার পানি বহন করে। পশুর নদীর তীরে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ অফিস অবস্থিত। এছাড়্ওা ঢাংমারি, করমজল, জোংড়া, মরা পশুর, নন্দবালা, হারবাড়িয়া, ভদ্দর এবং পাশাখালিতে বন বিভাগের অফিস রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট যেতে হলে পশুর নদী অতিক্রম করেই যেতে হয়।
সুন্দরবনের লাইফলাইন হচ্ছে পশুর নদী। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হিসেবে সুন্দরবনের গড়ে ওঠা ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে পশুর নদীর রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বনের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে এই নদী। নদীর তীরে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রানী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র ছাড়াও ঢাংমারি ডলফিন অভয়াশ্রম পশুর নদীতে অবস্থিত। এই নদী সংলগ্ন নন্দবালা, করমজল, জোংড়া, আন্ধারমানিক, মরাপশুর, ও ভদ্দর খালকে ইতিমধ্যে মাছের অভয়ারন্য ঘোষনা করা হয়েছে।
প্রায় বিশ হাজার জেলে পরিবার পশুর নদীতে মাছ আহরন করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাগেরহাট-খুলনা জেলার বিরাট এলাকা জুড়ে কৃষি কাজে পশুর নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। চিংড়ি, কাকড়া, ভেটকি, পার্শে, বেলেসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হচ্ছে পশুর নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করেই মোংলা, রামপাল, দাকোপ ও বটিয়াঘাটার অধিকাংশ মানুষের জীবন-যাত্রা গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের খালে-বিলে পশুর নদীর মাছের পোনা প্রবেশ করে এবং তা অত্র এলাকার মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটায়। নদীর চিংড়ি, কাকড়া ও কয়েক প্রকার সাদা মাছ রপ্তানী করে সরকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। এছাড়াও পশুর নদীকে ব্যবহার করেই বনজীবী, ব্ওায়ালী, মৌয়ালীরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। পশুর নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাট-বাজার, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও স্কুল-কলেজ। বর্তমানে পশুর নদীর ভাঙ্গন এবং দূষণে নদীপাড়ের মানুষ দিশেহারা পশুর নদীর দুই পাড়ের অধিকাংশ মানুষ হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের। দুঃখজনক হলেও সত্য পশুর নদীর পাড়ের এই সকল মানুষরা আজ ভাঙ্গন-দূষণ এবং নদীপাড়ের চলমান শিল্পায়নের মাধ্যমে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ।
মোংলা হল সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণের সর্বশেষ উপজেলা। পশুর-শেলা-মোংলা নালা নদীসমূহ চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে মোংলা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নকে। বানিজ্যক কর্মকান্ডের কারনে এই নদী ভাঙ্গনের সূত্রপাত বলে মনে করছেন নদী পাড়ের অধিবাসীরা। নদীর গতিরোধের চেষ্টা মূলতঃ নদী ভাঙ্গনের মূল কারন হলেও পশুর নদী ভাঙ্গনের মূল কারন হচ্ছে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, উন্নয়ন ও মুনাফালোভী ব্যবসা বানিজ্যের জন্য নদীতে নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি। এছাড়া অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও নদী ভাঙ্গনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। পশুর নদীর দুই পাড়ে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গন হচ্ছে, যা অস্বাভাবিক। গত এক দশকে পশুর নদী গিলেছে অনেক বসত-বাড়ি ও ফসলি জমি। নদীর এই নিষ্ঠুরতার কবলে পড়ে ভিটে মাটি ছাড়া হয়ে অনিশ্চিত শঙ্কার মধ্যে জীবন যাপন করছে হাজার হাজার মানুষ।
শিল্প মালিকেরা শিল্পায়নের জন্য জমি ভরাট করার সময় খাল, জলাশয় ও পানি চলাচলের সকল রাস্তাও ভরাট করে শিল্পায়নের উদ্দ্যোগ গ্রহন করায়, প্রতিদিন জোয়ার-ভাটায় পশুর নদীর দুঁই পাড়ে পানির অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তার সাথে যোগ হয় বাড়তি নৌযান চলাচলের প্রভাব। সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে পশুর ও মোংলা-ঘোষিয়াখালি চ্যানেলের ড্রেজিং কর্মকান্ড পরিচালনার পর, পশুর নদীর দুই পাড়ে ভাঙ্গনের মাত্রা বেড়ে যায়। তবে এর বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত কারনসমূহ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা আবশ্যক। ইতিমধ্যে মোংলা উপজেলার জয়মনি, সিন্দুরতলা, কলাতলা, কেয়াবুনিয়া, কোলাবাড়ি, চিলা, কানাইনগর, দিগরাজ, শেলাবুনিয়া, বিদ্যারবাহন ও মৈদাড়া এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব জীবন যাপন করছে। অন্যদিকে খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সমূহ হচ্ছে ঢাংমারি, বানীশান্তা, আমতলা, কাটাখালি, লাউডোব, খুটাখালি ও বাজুয়া। এই ভাঙ্গন জয়মনি, হারবারিয়া পেরিয়ে আরো ভাটিতে সুন্দবনের ভিতরে অব্যাহত রয়েছে।
অপরদিকে অপরিকল্পিত ড্রেজিং কর্মকান্ড পরিচালনা করায় ড্রেজিংকৃত বালু পশুর সংলগ্ন গ্রামে ফেলায় গাছপালা ও ফসলের মাঠে ফলন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ চরম অস্বাস্থ্যাকর পরিবেশে বসবাস করছে।
আজকের সংবাদ সম্মেলন থেকে আমাদের দাবিঃ
১. পশুর নদীর অস্বাভাবিক ভাঙ্গন-এর বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ নির্ণয় ও ভাঙ্গন রোধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
২. পশুরপাড় ও সন্নিহিত এলাকায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও ড্রেজিং বন্ধ করতে হবে।
৩. ভাঙ্গনে নিঃস্ব দুই পাড়ের মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. জলজ প্রাণীর নিরাপদ অভয়ারণ্যসমূহ সংরক্ষন করতে হবে।
৫. পশুর নদীর সকল প্রকার দখল ও দূষণ বন্ধ করতে হবে।