কৃতী অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, প্রশাসক, পরিবেশবিদ এবং সুশাসন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ (১২ মে, ২০১৮) বিকেল ৫টায় এক বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীতে ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে (বাড়ি # ২০, ধানমন্ডি # ২৭) অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা পাঁচটি পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে শিশু শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্মৃতি সংসদ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে এ বছর বইমেলা থেকে প্রকাশিত মোজাফ্ফর আহমদ স্মারক গ্রন্থটিরও আনুষ্ঠানিকভাবে মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতেই অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ছাড়াও সম্প্রতি প্রয়াত বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, ভাষা সৈনিক ও জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম এবং বিশিষ্ট গবেষক ও স্মৃতি সংসদের শুভাকাঙ্ক্ষী ড. সিমিন মাহমুদের কথা স্মরণ করে ও শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়। এরপর স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্মৃতি সংসদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্যে এ ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি ব্যতিক্রমী একটি আয়োজন। আমাদের আমলে আদর্শ শিক্ষক বলতে যা বুঝায় তিনি তারই অন্যতম দৃষ্টান্ত ছিলেন। পরে গবেষক হিসেবেও তিনি স্বনামধন্য হয়েছিলেন।

 

এরপর এ বছর অমর একুশে বইমেলাতে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মোজাফ্ফর আহমদ স্মারক গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন Ñ (মোড়ক উন্মোচনের ছবিতে ডান দিক থেকে) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, রাশেদা কে চৌধুরী, ড. আতিউর রহমান, ড. রওশন জাহান, সৈয়দ আবুল মকসুদ এবং বিধান চন্দ্র পাল সংক্ষিপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে গ্রন্থটির প্রধান সম্পাদক এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সহধর্মিনী . রওশন জাহান বলেন, যাঁকে হারিয়েছি তিনি আমার কাছেই শুধু মূল্যবান তাই নন, তিনি আরো অনেকের কাছেই মূল্যবান। তিনি এখনও নানা জনের ও কাজের মাঝে আছেন – এটা আমাকে প্রতিনিয়ত শক্তি ও সাহস যোগায়।

 

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্মৃতি সংসদের সদস্য সচিব বিধান চন্দ্র পাল। তরুণ প্রজন্মের ভাবনা উপস্থাপন পর্বে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক এবং গ্রীণ ভয়েসের কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন অধ্যাপক আহমদের পরিবেশ সম্পর্কিত দর্শন ও পরিবেশ সম্পর্কিত নানামুখি কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে বলেন, তিনি চিরকাল পরিবেশকর্মীদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। মাসিক লিগ্যাল ইস্যুর সহকারী সম্পাদক এবং রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের তরুণ গবেষক ইফতিখারুল ইসলাম অধ্যাপক আহমদের শিক্ষাভাবনা তথা উদার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গুণসম্পন্ন সর্বজনীন শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, অধ্যাপক আহমদ জীবনমুখি ও আত্মসমৃদ্ধিমূলক শিক্ষাপদ্ধতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি অপরাজনীতিমুক্ত শিক্ষালয় চেয়েছিলেন। উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবেও তিনি শিক্ষাকে দেখেছেন বলে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে সুজন ও টিআইবির নানামুখি কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের পার্টিসিপেটরী একশন রিসার্চের সমন্বয়কারী ও গণশিক্ষা আন্দোলন ফোরামের সমন্বয়কারী মাহমুদ হাসান রাসেল এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্টের প্রোগ্রাম অফিসার কাজী ফাতেমা বর্ণালী যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধে তারা উল্লেখ করেন, তাঁর কীর্ত্তি, নেতৃত্ব, সততা, নিষ্ঠা ও সাহসিকতা আজও আমাদের পথ দেখায়, আজও আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। ইউএন এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ইয়ূথ সেকশনের ফাহমিদা ফাইজা তার প্রবন্ধে বলেন, মানুষ হিসেবে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ছিলেন আদর্শবাদী এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির জন্য কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের পরিকল্পনা সম্পাদক আসজাদুল কিবরিয়া টুকরো নানান স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ২০০৯ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘জাতীয়তাবাদের অর্থনীতি ও অন্যান্য’ গ্রন্থটি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্যারের একটি অসাধারণ বই। স্যারকে বুঝতে এই বইটি অত্যন্ত সহায়ক, কিন্তু ২০০৯ সালের পর বইটি আর পুনর্মুদ্রণ হয়নি, তাই বইটি পুনর্মুদ্রণের জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

 

বক্তাদের বক্তব্যের আলোকে অভিমত ব্যক্ত করেন দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ . আতিউর রহমান বলেন অধ্যাপক আহমদের সাথে অনেক স্মৃতি এবং অনেক শেখা। সবদিকে এতো গুণাবলী খুব বেশি মানুষের মাঝে থাকে না, উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, তিনি ক্লাসের শিক্ষক নন, তিনি জীবনের শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলেন একদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু অন্যদিকে পরিবেশেরও প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। অধ্যাপক আহমদ যদি আজকে বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি এ সমস্ত বিষয়ে নিশ্চয়ই কথা বলতেন।

 

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকুসদ বলেন, তিনি ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত, বহুমুখী প্রতিভার একজন মানুষ। তাঁর কাজের পরিধিও বিস্তৃত ছিল, ফলে তাঁকে একটি পরিচয়ে পরিচিত করানো কঠিন। নাগরিক সমাজের আন্দোলনকে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে গেছেন বলেও তিনি এ সময় মন্তব্য করেন।

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, অসম্ভব রকমের আকর্ষণীয় ক্ষমতা ছিল তাঁর। সেইসূত্রে আমিও বাপা, সুজন, টিআইবি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়েছি। তাঁর কাছে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর মতো অনুকরণীয় শিক্ষকের এখন বড়ই অভাব বলেও এ সময় তিনি মন্তব্য করেন।

 

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে দেশাত্মবোধক গান ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী শিশুশিল্পী প্রপা হালদার। অধ্যাপক আহমদকে নিয়ে স্বরচিত দুটি কবিতা – শৈশববেলা এবং ছোটবেলার প্রকৃতি – পাঠ করে শোনায় গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী শিশুশিল্পী কবিতা আক্তার। এছাড়া অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে অধ্যাপক আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহজপাঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী আরেক শিশুশিল্পী সামসান রাইনা আহমেদ।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবর্গ, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি, মিডিয়া প্রতিনিধিসহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজিপি এ.এসএম শাহজাহান, ইউএনডিপির মোজাম্মেল হক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট আরিফ খান, ডালিয়া দাস, লিপিকা বিশ্বাস প্রমুখ।