১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার পৈশাচিকতা এ দেশ কখনও ভুলবে না, তাই ৪৬ বছর যাবৎ সর্বস্তরের মানুষ ১৪ই ডিসেম্বর রাস্তায় নেমে আসে। কেবল রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নয় বরং সে শোকের মাতম কালো ব্যান্ডেজ- হয়ে সমগ্র দেশজুড়ে সবার বুকে বুকে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও অনতিকাল পরেই সে শোক অশ্রু-ক্রোধ ও অর্জনের স্মারকহিসেবে ‘১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস’ এর আনন্দ হয়ে ফিরে আসে, তবুও বেদনাটুকু যেন রয়েই যায়; অতঃপর অসংখ্য মৃত্যু ও রক্তদামে অর্জিত লাল-সবুজের সার্বভৌম নিশানকে সবাই স্যালুট করে- অশ্রু মুছে। এভাবে ১৪ই ডিসেম্বর হয়ে সব শহীদানের সওগাত আমার পতাকায় ভাসে।
পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী দ্বারা নৃশংস গণহত্যার সাথে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা কেবল তাদের নারকীয় পৈশাচিকতার নতুন মাত্রা ভাবলে ভুল হবে বরং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বা আমাদের বিজয়অবধারিত জেনেই তা ঘটানো হয়েছিল,যাসন্দেহাতীতভাবে ভবিষ্যৎ জাতীয় জীবন প্রাসঙ্গিকতায়দেশ ও রাষ্ট্র বিরোধী জঘণ্য পরিকল্পনাকেই নিশ্চিত করে।
এক্ষেত্রে,তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তির সংশ্লিষ্টতাতেই তা ঘটানো হয়েছিল বিধায় তার প্রত্ত্যুৎরেও ন্যায়ত অনিবার্য হয়ে ওঠেরাষ্ট্রীয় ভূমিকাএবংসেটা কোন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে নয় বরং সামষ্টিক ক্ষেত্রে ঘটেছিল বলেই-এটা কেবল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দানের বিষয় নয়, বরং উত্তর প্রজন্মের স্বার্থে তা রাষ্ট্রীয় দায়ীত্বের অন্তর্গত। তাই এ দিনটিকে যদি রাষ্ট্রীকতা দ্বারা (রাষ্ট্রীয় ছুটি) নির্দিষ্ট না করা হয় তবে তা হবে রাষ্ট্রকৃত স্মৃতিহত্যার অপরাধ।
স্মর্তব্য, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৪৬ বছর পেরিয়ে এসেছে- যথারীতি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে এ দেশ ও তার মানুষই ছিল; তবুও উত্তর প্রজন্ম জানে না ১৪ই ডিসেম্বর কী, কেন, কিভাবে, কখন, কোথায় ঘটেছিল! দীর্ঘ বিক্ষয় আর জেঁকে বসা ভ্রান্তির বিরুদ্ধেÑ সরকারগুলোর উদাসীনতা তো বটেই এমনকি কোন রাজনৈতিক দলকেও ১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করার দাবীতে তেমন সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।বিশেষত,জাতীয় একটি দিন হিসেবে যৌক্তিকভাবেই তা যে রাষ্ট্রকৃত বা প্রাতিষ্ঠানিকতার শর্তকেঅনিবার্য করে তোলে সেটাও এত বছরে বোধগম্যহচ্ছেনা-এটা সদ্য স্বাধীন দেশ ও তার জাতীয় জীবনের প্রত্যুষে সেই সূর্য হারানোর আঁধার পরিণতি নয় কি?
এদিক থেকে, নাগরিকবোধ সম্পন্ন মানুষ মাত্রই অদ্যাবধি- স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের মধ্যেই গণহত্যার পদাংক মুছে ফেলার ভূমিকাকে চিহ্নিত করে এসেছে! স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার সরকার নিশ্চয়ই পাকিস্তানী রাষ্ট্রজান্তার উত্তরাধিকার এর পর্যায়ে নিজেদেরকে নামিয়ে দিতে ঘৃণা বোধ করবে।