জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, সারাদেশে এখন অস্তিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক সংকট, রোহিঙ্গা সংকট, খাদ্য সংকট, প্রশাসনিক দূর্বলতা, আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতির চরম অবনতি, বিচার বিভাগসহ সর্বক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজ করছে। দেশে এখন আইনের শাসন নেই বললেই চলে। তাই সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না এটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাই দশম সংসদ নির্বাচনের মতো একাদশ সংসদ নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করতে পারে বলে ধারণা করছেন এরশাদ।

আজ শনিবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলানায়তনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যৌথ সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

যৌথসভায় বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জি.এম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দীন আহমেদ বাবলু এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি, শেখ সিরাজুল ইসলাম, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, সুনীল শুভ রায়, এটিইউ তাজ রহমান, মেজর অব. খালেদ আখতার, কেন্দ্রীয় নেতা ইয়াহিয়া চৌধুরী এমপি, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, জহিরুল আলম রুবেল, নুরুচ্ছাফা সরকার, এ কে এম আসরাফুজ্জামান খান, শফিকুল ইসলাম মধু, মহসিন উল হাবলু, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সভা পরিচালনা করেন দলের যুগ্ন-মহাসচিব গোলাম মোহাম্মদ রাজু।

সভায় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ সাত্তার, অধ্যাপক দোলোয়ার হোসেন খান, সোলেয়মান আলম শেঠ, রত্না আমিন হাওলাদার, গোলাম কিবরিয়া টিপু, এম হাফিজ উদ্দীন আহমেদ, আবুল কাশেস, এম এ মান্নান, তাজুল ইসলাম চৌধুরী এমপি, উপদেষ্টা রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, কাজী মামুনুর রশিদ, নাজমা আক্তার, যুব সংহতির সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন, ছাত্র সমাজের সভাপতি সৈয়দ ইফতেখার আহসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এরশাদ দলীয় নেতাকর্মীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তোমরা আমার নয় বছরের শাসনামলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তুলে ধরো না। অথচ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা আমার সেই কর্মকাণ্ডের যে প্রশংসা করেছেন তাতে আমি অভিভুত হয়েছি। তারা সরকারি উচ্চ পদে থেকেও আমার প্রসংশা করেছেন।

সারাদেশ থেকে আগত দলীয় নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। কিন্তু তোমরা মনে রেখো ক্ষমতা কেউ হাত তুলে দেয় না। ক্ষমতা আদায় করে নিতে হয়। এজন্য দলকে আরো সুসংগঠিত করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, রোহিঙ্গারা আর ফিরে যাবে কি না আমি জানি না। কারণ মিয়ানমারে সেনা প্রধান বলেছেন রোহিঙ্গারা না কি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার গেছে, তারা বাঙ্গালী। সেনা প্রধানের এই বক্তব্যে পর মনে হয় না রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে পাঠানো যাবে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এরশাদ বলেন, আপনি যতই কুটনৈতিক তৎপরতা চালান না কেন মনে হয় না তারা আর ফিরে যেতে পারবে বা মিয়ানমারও তাদের ফেরত নেবে। তাই আমি অনুরোধ করবে তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে যদি জাতীয় পার্টির সাহায্য প্রয়োজন হয়, আমরা সাধ্যমত সাহায্য করবো।

ডিমের জন্য মারামারি দেখে হতবুদ্ধি এরশাদ
সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা গর্ব করে বলি মধ্যম আয়ের দেশ। অথচ তিন টাকার ডিম নেয়ার জন্য কত মানুষ গিয়েছিল? ‘তিন টাকার ডিম না খেলে কি হতো? কিন্তু আমাদের মন মানসিকতা এত নিচে নেমে গেছে। এটা তো দৈন্যতার লক্ষণ, দারিদ্র্যের লক্ষণ, হীনমন্যতার লক্ষণ। আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। ডিম খেতে মানুষকে উৎসাহী করতে ডিম দিবসে শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজন করা হয় ডিম মেলার। মেলায় তিন টাকা করে ডিম বিক্রির ঘোষণা দেয়া হয়। আর হাজারো মানুষের ভিড়ে হাঙ্গামায় পুরো আয়োজনই ভণ্ডুল হয়ে যায়। আর মানুষের ‘ডিম চাই’, ‘ডিম চাই’ বলে স্লোগান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র আলোচনা তৈরি করে।

এরশাদ বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী অস্থিরতা, খাদ্য সঙ্কট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি- এগুলোই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি। ১৫ বছরের একটি মেয়ে তার স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না। হয় তাকে হত্যা করা হয়, নয়তো আত্মহত্যা করতে হয়। একটি কিশোরকে গাছে বেঁধে মেরে ফেলা হয়। আমরা দেখলাম, প্রতিবাদ করলাম না। কেনো এ ঘটনাগুলো ঘটছে? এর কারণ, দেশে আইনের সুশাসনের অভাব। দেশে আইনের শাসন নাই বললেই চলে।

বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ
দশম সংসদ নির্বাচনের মতো একাদশ সংসদ নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করতে পারে বলে ধারণা করছেন এরশাদ। তিনি বলেন, আমরা ২৬ বছর ক্ষমতার বাইরে। এটা আনন্দদায়ক ছিল না, যন্ত্রণাদায়ক ছিল। অনেকে সমালোচনা করেন, তাদেরকে বলি, ২৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও, এতগুলো মামলা মাথায় নিয়েও এখন আমি বলতে পারি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারব। এতো বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে কোনো দল টিকেনি। আল্লাহর অশেষ রহমতে এই ২৬ বছর পরেও জাতীয় পার্টি বেঁচে আছে। কিন্তু বিএনপিকে দেখেন ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে। আগামী নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না এটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

জাতীয় পার্টি ছাড়া জনগণের সামনে আর কোনো আশার আলো নেই মন্তব্য করে এরশাদ বলেন, আমি হয়ত আর নাও আসতে পারি (চিকিৎসা ও শারীরিক পরীক্ষার জন্য সোমবার সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন)। জাতীয় পার্টি থাকবে, তোমরাও থাকবে। এই জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তোমরা এগিয়ে যাবে। আমার দুঃখ একটাই, আমার পাশে কেউ থাকে না। যখন বাইরে যাই শুধু মহাসচিব ও কয়েকজন থাকে।

আবেগী কণ্ঠে এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টি আমার প্রাণ। জাতীয় পার্টিকে আমি ভালোবাসি। মৃত্যুর আগে একবার জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চাই।

রওশন এরশাদ বলেন, ক্ষমতায় যেতে হলে দলকে আরো সুসংগঠিত করতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয় পার্টির নয় বছরের উন্নয়ন কর্মকণ্ড তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। আর পল্লীবন্ধু এরশাদ স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।

জিএম কাদের বলেন, যারা দল থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলে গেছেন তারা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আবার অনেক পরিক্ষিত কর্মীও সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে আমাদের কর্মসূচি হতে হবে বাস্তবধর্মী ও কল্যাণমুখী।

রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, জাতীয় পার্টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচনে যাবে না। বর্তমান সংবিধান অনুয়ায়ী যে নির্বাচন হতে তাতে অংশগ্রহণ করবে জাতীয় পার্টি। অবাধ ও সুষ্টু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনীতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে রাখতে হবে।

সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, ৩০০ আসনে নির্বাচন করতে হলে এখন থেকেই প্রতিটি কেন্দ্রে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্র কমিটি গঠন করতে হবে। ভোট কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখতে শক্তিশালী কর্মী বাহিনী তৈরি করতে হবে।