সুন্দরবন দিবস ২০১৮ পালন উপলক্ষ্যে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)সহ ৫৭টি সদস্য সংগঠনের উদ্যোগে আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখ সকাল ১১ টায় শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে “সুন্দরবন বিষয়ক ইউনেস্কোর প্রস্তাব সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন কর, বন বিনাশী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবিলম্বে বাতিল কর, সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর সকল কার্যক্রম বন্ধ কর, বন রক্ষায় উদ্যোগ নাও” দাবীতে এক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবি ও বাপা’র সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ এর সভাপতিত্বে সমাবেশে ঘোষনাপত্র পাঠ করেন সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন। বাপা’র যুগ্মসম্পাদক জনাব আলমগীর কবির এর সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য রাখেন সর্বজনাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, পাওয়ার সেল এর সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবি এডভোকেট ড. মো: জিয়াউর রহমান, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হোসেন, ঢাকা ইয়ুথ ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের সাধারণ সম্পাদক সোহাগ মহাজন প্রমুখ। সমাবেশে সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস্ মুভমেন্ট এর নির্বাহী প্রধান এডভোকেট মোঃ মোজাহেদুল ইসলাম মুজাহিদ, বাপা’র জাতীয় পরিষদ সদস্য নাজিম উদ্দিন, গ্রীন ভয়েস এর আব্দুস সামাদ প্রধান ও আব্দুস সাত্তার-সহ আয়োজক সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিগণ ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিগন অংশ গ্রহন করেন। সমাবেশ শেষে এক র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সুন্দরবনের ওপর যে অত্যাচার চলছে, তা খুবই দুঃখজনক। সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এটা কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্ববাসীর সম্পদ, এর ক্ষতি করার কোন অধিকারই আমাদের নেই। বরং একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। সরকারের উচিত ছিল সুন্দরবনের ক্ষতি হয় এমন কার্যক্রম কেউ গ্রহন করলেও তাতে বাধা দেয়া। অথচ আমরা লক্ষ্য করছি, একে রক্ষা ও সংরক্ষণের পরিবর্তে সরকারী উদ্যোগে ও অনুমোদনে বন বিনাশী অনেক শিল্প কল-কারখানা গড়ে উঠাসহ রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত পরিবেশ বিনষ্টকারী প্রকল্প নির্মিত হচ্ছে সেখানে। আমরা আশংকা করছি, পরিবেশ ও বন বিনাশী কার্যক্রম বন্ধ না হলে অতি দ্রুতই সুন্দরবন বড় বিপর্যয়ের দারপান্তে চলে যাবে। তাই সুন্দরবন বিনাশী সকল কার্যক্রম ও পদক্ষেপ বাতিল করে একে রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, আমরা এখনও মনে করি পরিবেশ, বন, অর্থনীতি তথা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে উভয় পক্ষের মধ্যে তথ্য ও বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা এবং ক্ষতিকর রামপাল প্রকল্প বন্ধের কোন বিকল্প নাই। অথচ সরকার এ বিষয়টিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে যাচ্ছেন ও রামপালে তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। সরকারী এহেন আচরণে সারা দেশের ও বিশে^র সকল সুন্দরবন ও পরিবেশ প্রেমী মানুষই উদ্বেগাকুল দিন অতিবাহিত করছেন। সারা বিশ^ আজ একমত যে, কয়লা একটি মারাতœক নোংরা জ¦ালানী। তাই সারা বিশ্ব যেটা পরিহার করছে, দেশ ও তার জনগণ-প্রকৃতি-সম্পদ-অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের স্বার্থে আমাদেরকেও সেটা পরিহার করতে হবে। তিনি জানান, গত বছরের প্রথমদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কর্তৃক দুই পক্ষের মধ্যে উন্মুক্ত বিতর্কের একাধিকবার আহবান জানানোর প্রেক্ষাপটে, তাঁর নিকট সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবিত বিতর্কের একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়, যার মূল কথা হচ্ছে: রামপাল বিষয়ক উদ্বেগ ভিত্তিক আলোচনার বিষয়সমূহ নির্ধারণ, সে বিষয়ে আমাদের দাবীসমূহের পক্ষের বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ, এসব দলিলের বক্তব্য বিষয়ে সরকারী মতামত প্রকাশ ও ভুল বা বিতর্কিত (যদি থাকে) হিসেবে সরকার চিহ্নিত বিষয়সমূহ নিয়ে উন্মুক্ত বিতর্কের আয়োজন। তারই পদক্ষেপ হিসেবে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে গত ২০ অগাস্ট ২০১৭ তারিখে রামপাল বিষয়ক ১৩টি গবেষণাপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এসব সুলিখিত গবেষণা প্রতিবেদন বিষয়ে আমরা দুই মাসের মধ্যে সরকারী মতামত ও প্রয়োজনমত উন্মুক্ত আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলাম; তার পর ৬ মাসাধিক কাল অতিবাহিত হয়েছে অথচ সরকার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন মতামত প্রদান করা হয়নি। সরকারী নিরবতা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এসব গবেষণাপত্রের যৌক্তিকতা বিষয়ে তাদের কোন দ্বিমত নেই। অতএব আর সময় ক্ষেপণ না করে এসব দলিলের সুপারিশ মোতাবেক রামপাল প্রকল্প বাতিল ঘোষনা ও বন রক্ষায় অন্যান্য করণীয় বিষয়ে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহন করা অতি জরুরী। তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এই বনকে বাঁচানোর স্বার্থে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী বা অভ্যন্তরের নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত অন্যান্য সরকারী-বেসরকারী সব প্রকল্প ও স্থাপনা নির্মান অবিলম্বে বন্ধ, বাতিল ও অপসারণ করতে হবে। আমাদেরকে সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য প্রবলভাবে উদ্যোগী হতে হবে। সমাবেশে তিনি ৪টি দাবী তুলে ধরেনঃ (১). রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ে ইউনেস্কো বিশ^ ঐতিহ্য কমিটির প্রস্তাব সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে; নির্মানের সকল কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে; (২). সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি কর্তৃক সরকারের নিকট জমাকৃত ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন ও ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্য কমিটির জুলাই’১৭ সভার সুপারিশের ভিত্তিতে বন রক্ষায় সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে; (৩). সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী বা অভ্যন্তরের নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত ৩২০টি ও সকল সরকারী-বেসরকারী প্রকল্প ও স্থাপনা অপসারণ, নির্মানাধীন প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ, বরাদ্দকৃত সকল প্লট অবিলম্বে বাতিল করতে হবে; ও (৪). সুন্দরবনের উপর আরোপিত অন্যান্য সকল অনিয়ম অত্যাচার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে; বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি ও তাদের কাজের পরিধি, একাগ্রতা, সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি জানান, আজকের এই সভায় উল্লেখিত ও গৃহিত এ সব দাবী আদায় তথা সুন্দর বন রক্ষা নিশ্চিত করতে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি কর্তৃক সরকারী পর্যায়ে চলমান যোগাযোগ ও অধিপরামর্শ কর্মসূচির (এডভোকেসি) পাশাপাশি সারা দেশে সকল জেলা উপজেলায় এই দাবীর ব্যাপক প্রচার ও জন-উদ্বুদ্ধকরণ, দেশ ব্যাপি সামাজিক-পরিবেশগত ও উন্নয়ন কেন্দ্রিক বেসরকারী সকল সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ ও সংযুক্তকরণ, এ সব দাবী আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তি ও নির্বাচনের অন্যতম প্রধান নাগরিক দাবীতে পরিণত করার জোর প্রচেষ্টা গ্রহন করবে।

অধ্যাপক এম এম আকাশ, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলের যুক্তিকতা তুলে ধরে বলেন দেশের ও বিদেশের সকল আধুনিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সকল বিজ্ঞানী ও ইউনেস্কো পরিস্কার গবেষণা তথ্যসহ বলেছে যে রামপাল প্রকল্প সুন্দরবন বিধ্বংসী হবে। তাই বিবেকের দায়েই আজ সকলকে সুন্দরবন রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের এই আন্দোলন জনগনের অধিকার রক্ষার আন্দোলন, প্রকৃতি-পরিবেশ ও দেশ প্রেমের আন্দোলন। তাই এই আন্দোলনের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, কয়লা এমন একটি ক্ষতিকর পদার্থ যা পানি, মাটি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে। সারা বিশ্ব কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে এসেছে, এমনকি ভারত ও চীন কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছে। তাই দেশ, পরিবেশ ও জনস্বার্থে রামপাল প্রকল্প বিষয়ে অনমনীয়তা থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে ঐক্যমতে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার স্বার্থে পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে।