সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আজ ১৩ অগাস্ট ২০১৭, রবিবার, সকাল ১১.০০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গোলটেবিল কক্ষে “সুন্দরবনের পাশে তিন শতাধিক নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ ও বাতিলের দাবীতে” এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে এবিষয়ে মুল বক্তব্য রাখেন সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক এডভোকেট সুলতানা কামাল। এছাড়াও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, খুশী কবির, অধ্যাপক বদরুল ইমাম, রুহিন হোসেন প্রিন্স, শরীফ জামিল ও সদস্য সচিব ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বক্তব্য রাখেন।

মুল বক্তব্যে এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, আমরা গণমাধ্যমসূত্রে অবগত হয়েছি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিবেশ কমিটির ০৬ অগাস্ট তারিখের সভায় সুন্দরবন ঘেঁষে ৩২০টি শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, নব্বই দশকের শেষ দিকে স্থাপিত ১৮৬টি, ২০১৫ সালের পর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রাপ্ত ১১৮টি ও নতুন ১৬টি স্থাপিত প্রতিষ্ঠান। এ সবের মধ্যে অনেকগুলোই মারাতœক দূষণকারী স্থাপনা। সর্বশেষ ১৬টির মধ্যে আটটি এলপিজি বোতলজাত করণ কারখানা, যা মারাতœক দূষণকারী লাল ক্যাটাগরীভুক্ত। আর বাকি ৮টিও বড় ও মাঝারি আকৃতির স্থাপনা। তিনি বলেন, আমরা জানি ১৯৯৯ সন থেকেই সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিমি স্থান সরকারীভাবেই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষিত হয়ে আছে যেখানে কোন শিল্প কারখানা স্থাপনের পূর্বে বন ও প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি ইউনেস্কোও বলেছে যে, কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা না করে এখানে কোন শিল্প স্থাপনা করা যাবেনা। অথচ এখানে এতগুলো শিল্পস্থাপনাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য, ইউনেস্কোর নিকট ওয়াদা, দেশীয় আইন – সবকিছুরই ব্যত্যয় ঘটিয়েই সুন্দরবনের জন্য এতবড় ওসর্বনাশা সিদ্ধান্তটি গ্রহন করা হল। এরকম একটি স্পর্শকাতর বনের অস্তিত্বের প্রশ্নে এটি একটি বৃহৎ নেতিবাচক সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব হবে দীর্ঘ মেয়াদী। আমরা সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে এহেন বনবিধ্বংসী ও পরিবেশ বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও এসব বন্ধের জোর দাবী জানাই। তিনি তার বক্তব্যে সুনির্দিষ্ট ৪-টি দাবী উত্থাপন করেনঃ ১) সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী বা অভ্যন্তরের নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত ৩২০টি বা সকল সরকারী-বেসরকারী প্রকল্প ও স্থাপনা অপসারণ, নির্মানাধীনপ্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ, বরাদ্দকৃত সকল প্রকার প্লট অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।; ২). সুন্দরবন বিষয়ে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত (জুলাই ২০১৭) ইউনেস্কো কমিটির গৃহিত ১১টি প্রস্তাব হুবহু ও সময় মাফিক বাস্তবায়ন করতে হবে।; ৩). রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ে সরকারী পরিবেশগত সমীক্ষা ও অন্যান্য প্রতিবেদন অবিলম্বে বাতিল করতে হবেও ইউনেস্কোর নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞান ভিত্তিক পরিবেশগত সমীক্ষা পরিচালনা করে নতুন স্থান নির্ধারণ করতে হবে।; ৪). উপরোল্লেখিত সুন্দরবনের উপর আরোপিত সকল অনিয়ম অত্যাচার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি ও তাদের কাজের পরিধি, একাগ্রতা, সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমরা চাই, তবে সেটা হতে হবে পরিবেশ ও জনবান্ধব। পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে যে ভাবে অপরিকল্পিত ভাবে শিল্পকারখানার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তা সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদেরকে আরো উদ্বিগ্ন করল। এতে ভবিষ্যত প্রজন্ম ক্ষতির সম্মূখীন হবে। এটা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। তিনি নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, ফেডারেল চেম্বারের লিডার ও পরিবেশবিদদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ জরিপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহনের দাবী জানান।

খুশী কবির বলেন, পরিবেশ-প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থে সরকার ভুল পথে চলছে। সামান্য কিছু ব্যক্তির স্বার্থে বিশাল জনগোষ্ঠীকে হুমকীর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তণের প্রভাবের যে হুমকীর মুখে রয়েছে, পরিবেশ বিরোধী এসকল কার্যক্রমের মাধ্যমে এই হুমকীকে আমরাই আরো বাড়িয়ে দিচ্ছি। যা মোটেই উচিত নয়। জনগন ও বিজ্ঞানীদের মতামতকে উপেক্ষা করে দেশ, সম্পদ ও পরিবেশবিনাশী এধরণের কার্যক্রম থেকে সরে আসার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানান।

 

 

অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সরকার পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষায় করা নিজের আইন ও ওয়াদা পদে পদে ভঙ্গ করছে। ইউনেস্কোর ৪১-তম সভার সিদ্ধান্তসমূহের ধারাগুলোকে তারা ভূলভাবে উপস্থাপন করছেন। ইউনেস্কোর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে তাদের যে আপত্তি রয়েছে তা থেকে সরে আসেনি, বরং সুন্দরবন রক্ষায় তারা আরো কিছু শর্ত দিয়েছে। এই সকল শর্তে সুন্দরবনের পাশে কোনভাবেই শিল্পকারখানার অনুমোদন দিতে পারে না।

ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, সুন্দরবনের পাশে সম্প্রতি ৩২০টি শিল্পকারখানার সরকারী উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কর্তৃক অনুমোদন প্রদান খুবই দুঃখজনক। এবিষয়ে মাননীয় পরিবেশ মন্ত্রীর মতামত ও বক্তব্যও অগ্রহনযোগ্য। আমরা সুন্দরবন তথা পরিবেশবিরোধী এধরণের সিদ্ধান্ত পূর্নবিবেচনা করার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির প্রতি জোর আহবান জানাচ্ছি।

জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ৩২০টি শিল্প কারখানার অনুমোদন দিয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের পথকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।

জনাব শরীফ জামিল বলেন, জাতীয় পরিবেশ কমিটি হচ্ছে সরকারী অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। জাতি আশা করে এই কমিটি সকল সিদ্ধান্ত ও বিবেচনা হবে পরিবেশের পক্ষে। অথচ সম্প্রতি তাদের সিদ্ধান্তে পরিবেশবাদীসহ সকল মহল হতাশ হয়েছে। পরিবেশ ও সুন্দরবনকে রক্ষার বিষয়টি কোন প্রকার বিবেচনায় না নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এই কমিটি কর্তৃক পরিবেশবিরোধী এধরণের সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতির জন্য একটি নেতিবাচক উদহারণ।