‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়:নিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরী,মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বক্তব্য কি শুনুন

(১) গত ৩ জুলাই সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশের পর ১ লা আগষ্ট পুর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করে। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকের নিয়োগ, পদোন্নতি ও অপসারনের ক্ষমতা সুপ্রীম জুডিশিয়াল কউন্সিলের উপর থেকে অপরিপক্ক ও অনির্বাচিত পার্লামেন্টের উপর ন্যস্ত করা হয়। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্নভাবে খর্ব করা হয় যা সংবিধানের পরিপন্থি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ফলে সংবিধানের ৯৬ ধারা মোতাবেক এ ক্ষমতা আবারও সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের উপর ন্যস্ত হয়।
(২) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশের পর থেকেই এ নিয়ে অনাকাংখিত বিতর্ক শুরু হয়। একদিকে সরকারের দু:শাসন, অন্যদিকে জনগণের কাংখিত রায় নিয়ে বেফাঁস কথাবার্তা ও আচরনের কারনে সরকারের ক্ষমতায় থাকা উচিৎ কিনা- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জনগন এমনিতেই সরকারের উপর ক্ষুব্ধ। অধিকন্তু রায় নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ির কারনে জনগণের অন্তর্নিহিত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত সরকারের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। এ বিষয়ে সরকার সতর্ক আছেন বলে আশা করি।
(৩) বর্তমান সংসদে অনেক সদস্য দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলার আসামী। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার এক ভাষণে বলেছেন ‘সংসদে শতকরা ৮০ ভাগ সদস্য ব্যবসা-বাণিজ্যসহ ব্যক্তিগত স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত।’ এরা যে কোন সময় মামলার রায় নিজের পক্ষে নেয়ার জন্য বিচারকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ব্যর্থ হলে যে কোন বিচারকের অপসারনের জন্য পার্লামেন্টে উদ্যোগ গ্রহনও অস্বাভাবিক নয়। সংবিধানের ৭০ ধারা বহাল থাকায় সরকার প্রধান চাইলে যে কোন আইন যেমন প্রণয়ন করতে পারেন তেমনি বিচারকদেরও অপসারন করতে পারেন। দেশে এক কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট বহাল থাকায় সংসদ নেতা ও পার্লামেন্টের এ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কোন পথ নেই। এতে পার্লামেন্টের উপর বিচার বিভাগের ভার কোনোভাবেই ন্যস্ত করা যায় না।
(৪) একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যায়, আমাদের সংবিধানে Supremacy of Constitution নিশ্চিত করা আছে। এতে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে এ ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। জনগনের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপুর্ন হয় তাহলে সে আইনের যতটুকু অসামঞ্জস্যপুর্ণ ততটুকু বাতিল হবে। প্রশ্ন হলো কে বাতিলের দায়িত্ব পালন করবে? সংবিধানের অভিভাবক ও ব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে এ দায়িত্ব সুপ্রীম কোর্টে উপর ন্যস্ত হয়। সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতিসহ জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে আরও দুইজন বিচারপতি নিয়ে গঠিত। অতএব এর উপর আস্থা রাখা যায়। প্রয়োজনে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সংস্কার করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই তা বাতিল হতে পারে না। এমতাবস্থায় সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপুর্ণ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের যে রায় ও পর্যবেক্ষন সুপ্রীম কোর্ট দিয়েছে তা সুগভীর চিন্তা প্রসূত ও সম্পূর্ন বৈধ।

(৫) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় হাই কোর্টে পাস হওয়ার পর তা নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রীম কোর্টে আসে। প্রধান বিচারপতিসহ ৭ জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত ফুল কোর্ট শুনানী শেষে হাইকোর্টের রায়টি বহাল রেখে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রদান করেন। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এ রায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হার একক অভিপ্রায়ের বিষয় নয়। অথচ শাসকদলের অনেক নেতা জনাব সিন্হার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে সমালোচনা করছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী শাসক দলের পক্ষে যাওয়ায় তারা খুব খুশী হয়েছিলেন। আর ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তাদের গাত্র দাহ শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে রায় পক্ষে গেলে খুশি আর বিপক্ষে গেলেই অগ্নিশর্মা।
(৬) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও পর্যবেক্ষনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, চলমান দুর্বৃত্তায়িত অপরাজনীতি চর্চা ( উপনিবেশিক ধাঁচের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা), অপরিপক্ক ( সত্যিকার অর্থে অবৈধ) সংসদীয় ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে জোরপুর্বক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে জনগণের সম্পদ লুন্ঠন, হত্যা, খুন, দুর্নীতি-দখলবাজী, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং আমিত্ববাদ চর্চার কথা উল্লেখ করে এ থেকে উত্তরনের দিকদর্শন রয়েছে। সামগ্রিক বিচারে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের এ রায় ঐতিহাসিক যা যুগ যুগ ধরে পঠিত ও অনুসরনীয় হবে। এ প্রেক্ষিতে ভারতের সংবিধান ও সরকার সম্পর্কে ভি এন খান্না রচিত পুস্তকের একটি উদ্ধৃতির দিকে নজর দেয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে-

Expressing the importance of Supreme Court our founding fathers described it as the `guardian of the Constitution’ or a `Champion of liberties’ and a `watch dog of democracy.’ The role of Supreme Court is wide and self explanatory. Our Supreme Court has always protected the Constitution. It has watched the activities of the government and stoped it wherever necessary.

আমাদের সুপ্রীম কোর্ট ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে এর ব্যাতিক্রম কিছুই করেনি। এ রায়ের মধ্যদিয়ে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক যে সংশোধনী আনা হয়েছিল তা-ই বাতিল করা হয়েছে।

(৭) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের সারবত্তা ও দিকদর্শন উপলব্ধি করে দেশকে একটি সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলার দিকে নিয়ে যাওয়া যেত। অথচ তা না করে এ নিয়ে অনাকাংখিত বিতর্ক ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। শাসক দল বলছেন, রায়টি পূর্ব পরিকল্পিত, ষড়যন্ত্রমূলক ও আবেগতাড়িত। রায়ে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। রায়ের অনেক পর্যবেক্ষনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। জাতীয় সংসদকে খাটো করা হয়েছে। কোন কোন নেতা প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ না করলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুমকী দিয়েছেন। এক মন্ত্রীতো বলেই ফেলেছেন ‘যতবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা হবে, আমরা ততবার সংসদে তা পাস করবো।’ দু’টি সামরিক শাসন দেশকে ব্যানানা রিপাবলিকে পরিনত করেছে- রায় ও পর্যবেক্ষন থেকে এ অংশ বাদ দেয়ার দাবী করেছেন বিএনপির এক নেতা। এ ধরনের দাবী ও উক্তিকে গোঁয়ার্তুমি না ছেলেমি বলা হবে তা ভাববার বিষয়।

শাসক দল বুঝতে পারছেনা যে, রায় হাইকের্টে পাস হয়ে প্রধান বিচারপতিসহ ফুলকোর্টে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা মতামতের ভিত্তিতে প্রনীত হয়েছে। সেখানে একজনের পূর্ব পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র ও আবেগ কোন ভাবেই কার্যকর হতে পারে না। আর এ সকল বিচারকরাতো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রাপ্ত। এমতাবস্থায় সকলেই আবেগতাড়িত হয়ে বা ষড়যন্ত্র করে রায় দেবেন তা চিন্তাই করা যায় না। আর তা চিন্তা করলেতো আওয়ামী লীগ সরকারকেই অদক্ষ ও অদূরদর্শী (Myopic) সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করতে হয়।
(৮) ইতিহাস বিকৃতির কথা আসলে বলতে হয় বিচারকরা নয়, স্বাধীনতার পর যারা ক্ষমতায় গিয়েছেন তারাই ইতিহাস বিকৃত করেছেন। যে দেশের ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, পেশাজীবী, পুলিশ,ইপিআর ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা মিলে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে। যে দেশের ছাত্র, যুবক, কৃষক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ৫২ থেকে একাত্তর পর্যন্ত সংগ্রাম করে রক্ত দিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সে দেশে কেউ স্বাধীনতার একক কৃতিত্বের দাবীদার হতে পারে না। এতে ইতিহাসের চরম বিকৃতি হয়। যে কোন আন্দোলনেই একজন নেতা থাকে। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ৬ দফা প্রদানসহ অনেক আন্দেলনেই বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাত্তরের নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকলেও তিনিই ছিলেন বাঙ্গালি জাতির সশস্ত্র সংগ্রামে প্রেরনার উৎস। কিন্তু ১৯৬২ সালেই স্বাধীনতার রূপকার সিরাজুল আলম খান আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদকে সাথে নিয়ে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গঠন করেন। এ নিউক্লিয়াস এ দেশের ছাত্র-যুব সমাজকে গোপনে স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠিত করেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার পর নিউক্লিয়াসই ৬ দফা আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছে, গণভিত্তি দিয়েছেন। ৬৯ এর এগার দফা আন্দোলনের পরিকল্পনাকারীও ছিল নিউক্লিয়াস। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আ স ম আবদুর রব এর হাতে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ শাজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ সবই ছিল নিউক্লিয়াসের পরিকল্পনা। এ সকল ঘটনা ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণার অনিবার্যতার সৃষ্টি করেছিল। এগুলোওতো ইতিহাসের অংশ। তাজউদ্দীন আহমেদসহ প্রবাসী সরকারের নেতৃবৃন্দ, বিএলএফ ও এফএফসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বাহিনী গঠন ও নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ববর্গ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মতামত গড়ে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত নেতা ও কুটনীতিকবৃন্দ এবং মাওলানা ভাসানীসহ প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভূক্ত নেতৃবৃন্দের ভুমিকাওতো ইতিহাস থেকে বাদ দেয়া যায় না। এসব কথা বললে কি স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করা হয় ? ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়েও বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা বহু বার উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের যাদের যতটুকু অবদান আছে ততটুকু স্বীকার করে নিলে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে কোন ক্রমেই অস্বীকার করা হয় না। অস্বীকার করা হয় আমিত্ববাদ। আমরা শব্দ দিয়ে শুরু করে স্বাধীনতার যে ঘোষণা পাঠ করা হয়েছিলো তা বিগত ৪৬ বছরেও কার্যকর হয়নি। সে জন্যই আমিত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বললে গায়ে ফোস্কা পড়ে।

(৯) শাসক গোষ্ঠী প্রধান বিচারপতির উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার হুমকী, রায়কে আবেগ তাড়িত, ষড়যন্ত্রমুলক, অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক হিসাবে আখ্যায়িত করেও কোন কাজ হচ্ছেনা। জনগণ এ ধরনের কর্মকান্ডকে সরকার কর্তৃক আদালত অবমাননা ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল বলে আখ্যায়িত করছে এবং ক্রমান্বয়ে সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এতে সরকার একটু দ্বিধা-দ্বন্ধেই পড়ে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে সাবেক প্রধান বিচরপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব খায়রুল হক আমরা ব্যক্তিতান্ত্রিক ও দলতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে বাস করছি- এ সত্যতাকে পাশ কাটিয়ে বললেন, ‘আমরা বিচারকদের প্রজাতন্ত্রে বাস করছি।’ তার এমন বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের পর আরেক সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব মাহমুদুল আমিন চৌধুরী যখন বললেন ‘রায় পাল্টানোর তরিকা আছে’ তখন আবারও সরকার উজ্জীবীত হয়ে ওঠেন এবং কৌশল পাল্টানোর দিকে এগিয়ে যান। সকল রীতি-নীতি ভঙ্গ করে সরকারী দলের এক নেতা রায়ের বিরুদ্ধে রিভিশন পিটিশন দিলে রায় তাদের পক্ষে যাবে কিনা এ নিয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। পত্র-পত্রিকার সংবাদে জানা যায় সেখানে তিনি দু’টি বিষয় জানতে চেয়েছেন-
(ক) আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের জন্য কষ্টকর ও অপমানজনক পর্যবেক্ষনসমুহ রায় থেকে এক্সপাঞ্জ করে দেবেন কিনা ? অথবা
(খ) সরকার রিভিশন পিটিশন দিলে আদ্ালত পিটিশন মোতাবেক তাদের নিকট আপত্তিজনক পর্যবেক্ষনসমুহ বাদ দিয়ে দেবেন কিনা?

(১০) কি ধরনের হীন মানসিকতা থাকলে মামলার কি রায় দিতে হবে তা বলার জন্য একজন নেতা ও মন্ত্রী প্রধান বিচারপতির নিকট ধর্না দিতে পারেন। ভরসার বিষয় হলো, প্রধান বিচারপতি নাকি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন- রায় পরিবর্তনের কোন প্রশ্নই আসেনা। রায়ে দুটি অংশ থাকে। এর একটি নির্দেশনা, অন্যটি পর্যবেক্ষন। রায়ে পরিবর্তনের প্রশ্নই আসেনা- এ কথার মধ্য দিয়ে তিনি রায় ও পর্যবেক্ষন কোনটাই যে পরিবর্তন করতে চাননা, সে বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ আলোচনার আগেও তিনি সাংবাদিকদের নিকট স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিচার বিভাগ সরকার ও বিরোধী দল- কারও ফাঁদেই পা দেবেনা। প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিরাও কোন চাপের কাছে মাথা নত করবেন না- এ বিশ^াস জনগণের আছে।

(১১) দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরার জন্য সুপ্রীম কোর্টের রায় ও পর্যবেক্ষনের একটি অংশ তুলে ধরা খুবই প্রাসঙ্গিক। তা হলো- রায়ে লেখা হয়েছে;
“এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি, যেখানে ভাল মানুষ আর স্বপ্ন দেখেনা, কিন্তু খারাপ লোকেরা আরও লুটপাটের জন্য বেপরোয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোনো নজরদারী বা তদারককারী প্রতিষ্ঠান নেই।”
যে সমাজে মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, সেই সমাজ ভয়ংকর। যে রাষ্ট্রে মানুষ প্রতিবাদ করতে কুন্ঠিত, সেই রাষ্ট্র কখনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক হতে পারে না। সামরিক শাসনামলের সমালোচনা করে রায়ে লিখা হয়;
“ ক্ষমতালোভীরা দু’বার আমাদের রাষ্ট্রকে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ এ পরিনত করেছিল, যেখানে ক্ষমতালোভীরা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জনগণকে পণ্যরূপে দেখেছে, ধোকা দিয়েছে। তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি, অপব্যবহার করেছে। তারা নানা রকম ধোকাবাজির আশ্রয় নিয়েছে। কখনো ভোটের নামে, কখনো জোরপূর্বক নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো নির্বাচন না করে। আর এর মধ্য দিয়েই সুস্থ ধারার রাজনীতি পুরোপুরি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। এসব অগণতান্ত্রিক শাসনামলের নোংরা রাজনীতির চর্চা আমাদের সার্বিক রাজনীতিকে মারাত্মক ক্ষতি করেছে।”

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়;
“অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার আকাংখা ও প্রতিরোধের স্পৃহার মাধ্যমে আমরা সামরিক শাসনের থাবা থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু পরাজিত হয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্রে। এমনকি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা আমাদের একটি প্রতিষ্ঠানকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। রাষ্ট্রক্ষমতার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার আরেক রূপ, সাম্প্রতিক সময়ে তা গুটিকয়েক মানুষের একচ্ছত্র বিষয়ে পরিণত করেছে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণে আত্মঘাতি প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার লিপ্সা মহামারীর মতো, যা একবার ধরলে তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে চাই, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, কোনো ক্ষমতাধর দৈত্যের জন্য নয়।”

রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন;
“মক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যার সুরক্ষায় শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। তাই এ্যাটর্নী জেনারেলের আবেগপূর্ন যুক্তি গ্রহণ করতে আমরা অক্ষম। এটাও স্বীকৃত যে উভয়পক্ষ স্বীকার করেছে, বিচার বিভাগের স্বধীনতা মৌলিক কাঠামো, আর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। আর এই আদালত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল-কে বিচার বিভাগের স্বধীনতার স্বার্থে সু-রক্ষা দিয়েছেন।”

(১২) এক দিকে সর্বোচ্চ আদালতের প্রেরনামূলক রায় অন্য দিকে সরকারের চরম স্বৈরাচারী ও নির্লজ্জ আচরণ জনগণকে আরো ভালভাবে বুঝতে শিখিয়েছে, শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নয়, ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য অবাধ গণতন্ত্র কায়েম, ব্যক্তিতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও আমিত্ববাদের অবসান আবশ্যক। গণআন্দোলনকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে এ লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন-
(ক) জনগণের মৌলিক-মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অবাধ রাজনৈতিক কর্ম-কান্ডের অধিকার ও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা।
(খ) দেশে প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান ও স্থানীয় সরকারসমুহকে স্ব-শাসিত করার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ এবং এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক ক্ষমতার অবসান করা।
(গ) বিভিন্ন শ্রম-কর্ম-পেশা, নারী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত¦ার মধ্য থেকে অদলীয়ভাবে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে পার্লামেন্টের উচ্চ-কক্ষ গঠন এবং নির্বাচনকালীন সময়ে এ উচ্চ-কক্ষ থেকে সরকার গঠনের বিধান করা।
(ঘ) হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্ট যাতে সাধারন দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলাসমুহের দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে
তার জন্য সংবিধান সংশ্লিষ্ট রীট ও আপীলসমুহ নিষ্পত্তির জন্য সাংবিধানিক আদালত গঠন করা।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় জনমনে যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে তাকে এ পথেই বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব। এর জন্য দুই জোটের বিকল্প তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য।
গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন জেএসডি সভাপতি জনাব আ স ম আবদুর রব। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেএসডি সাধারন সম্পাদক জনাব আবদুল মালেক রতন।

আলোচনায় অংশগ্রহস করেন অধ্যাপক ডা. একিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বেগ মাহতাব উদ্দীন প্রমুখ।
গোলটেবিল আলোচনায় জেএসডি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জনাব এম এ গোফরান, জনাব আতাউল করিম ফারুক, জনাব মো: সিরাজ মিয়া, মিসেস তানিয়া রব, জনাব শহীদ উদ্দীন মাহমুদ স্বপন, এ্যাড. কে এম জাবির, জনাব কামাল উদ্দীন পাটোয়ারী, জনাব এস এম আনছার উদ্দিন, এ্যাড. সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল, জনাব মোশারফ হোসেন, জনাব এস এম রানা চৌধুরী, এ্যাড. গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী,জনাব সাহিদ সিরাজী ও এ্যাড. সৈয়দা ফাতিমা হেনা, জনাব ফিরোজ আলম মিলন, গোলাম রাব্বানী জামিল প্রমুখ।