বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চারশো বছরের প্রাচীন নগরী ঢাকা। জনসংখ্যার প্রবল চাপে ও নগরকেন্দ্রীক কর্মসংস্থানের কারণে ঢাকার নগরায়ন অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্তার লাভ করেছে। নগরায়ন ক্রমশ নিঃশেষ করছে বুড়িগঙ্গাকে। বিগত ৩০-৪০ বছরের নগর জীবনের বিরূপ প্রভাবে দূষিত এই বুড়িগঙ্গা। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা ভয়াবহ দূষণের শিকার। শিল্প বর্জ্য, সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের বর্জ্য ও গৃহস্থালী বর্জ্যের কারণে বুড়িগঙ্গা দূষিত বর্জ্যের আধারে পরিনত হয়েছে।

এক জরিপে প্রকাশিত হয়, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীর ৬০ ভাগ দূষণের দায় শিল্পবর্জ্য, ৩০ ভাগ বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং ১০ ভাগ গৃহস্থলী বর্জ্য দ্বারা দূষিত হয় বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন ঢাকা শহরের চার হাজার পাঁচশত টন আর্বজনা ফেলা হচ্ছে। বাইশ হাজার লিটার বিষাক্ত ট্যানারী বর্জ্য প্রতিদিন এই নদীতে সরাসরি গিয়ে পড়ত। এছাড়া পলিথিন জমে নদীটির তলদেশে ১০-১২ ফুট ভরাট হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেরানীঞ্জের খোলামোড়া এলাকা থেকে পোস্তগোলা এলাকা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পানি শীত কালে কালো রঙের। প্রতিনিয়তই নাকে মুখে রুমাল চেপে স্থানীয়দের নৌকা পারাপার হতে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এককভাবে বুড়িগঙ্গা নদীর সর্বোচ্চ দূষণের দায় হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্পসমূহের হলেও কয়েকমাস আগে ট্যানারী শিল্প স্থানান্তরের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা ট্যানারী দূষণমুক্ত হতে চলেছে। কিন্তু বিগত এক দশকের বেশী সময় ধরে শ্যামপুরের ডায়িং কারখানাসমূহ থেকে মারাত্মক দূষিত বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হচ্ছে, যা এককভাবে বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য অন্যতম দায়ী। বর্তমান বুড়িগঙ্গা সেতু (পোস্তাগলা ব্রীজ) থেকে কদমতলী, শ্যামপুর, ধলেশ্বর, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরী হয়ে মুন্সিখোলা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এসমস্ত কলকারখানা গড়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর মতে ১৫-২০ বছর আগেও বর্তমান সড়ক পর্যন্ত ছিল নদী। তাদের চোখের সামনেই বুড়িগঙ্গা থেকে ড্রেজিং করা বালু এবং ময়লা আবর্জনার স্তুপ ফেলে ১৯৯৮ সাল থেকেই গড়ে উঠতে থাকে অপরিকল্পিত ডায়িং, ব্যাটারী ও রোলিং মিল। বর্তমানে শুধুমাত্র কদমতলী ও শ্যামপুরে ডায়িং কারখানার সংখ্যা প্রায় ৪২টি। এগুলোর মধ্যে – টিবিআই, আল মদিনা, চাঁদনী, মিতালী, শারমিন, পাকিজা, চমক, ভাই-ভাই ডায়িং অন্যতম। ম্যাচ ফ্যাক্টরী ও মুন্সিখোলা পর্যন্ত ছোট বড় সর্বমোট ডায়িং কারখানার সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০টি। কিন্তু অত্যন্ত দূভার্গ্যের বিষয় এসকল ডায়িং কারখানা হতে পরিত্যাক্ত সকল বর্জ্য গোপন পাইপ লাইনের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এসকল ডায়িং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে কষ্টিক এসিড, সায়ানাইড, মার্কারী, সীসা, নি¤œমানের রংসহ ৬২ ধরণের ক্ষতিকারক রাসায়নিক বর্জ্য। এলাকাবাসী ও কিছু কারখানার শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, উক্ত কারখানাগুলোর সাথে সংযুক্ত ৬৪টি নালাসমূহ হতে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্যসহ আরো অনেক ক্ষতিকারক রঞ্জক পদার্থ কিছু গোপন পথ হয়ে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পতিত হচ্ছে। অথচ বর্জ্য পরিশোধনের জন্য কোন পরিশোধন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি।

এছাড়াও ছোট বড় ১০০ টির মত রোলিং মিল, কাঁচ ও মেলামাইন তৈরীর কারখানা রয়েছে ঐ এলাকায়। এসকল কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশছে। ট্যানারী দূষণের পর সরাসরি বুড়িগঙ্গায় মারাত্মক দূষণের কারণ হচ্ছে শ্যামপুরের প্রায় ৪২-টি ডায়িং কারখানার বর্জ্য।

অতিরিক্ত দূষণের ফলে পাল্টে যাচ্ছে নদীর পানির রং। বর্ষাকালে পানি বৃদ্ধির ফলে বুড়িগঙ্গা নদীর উপুরিভাগের পানির রং কিছুটা পরিবর্তন হলেও বর্ষা শেষ না হতেই বুড়িগঙ্গা আবারো ফিরে পাচ্ছে তার দূষণ কবলিত রুপ। ধলেশ্বর খালের কিনারায় পানি এমন রং ধারণ করেছে যে, বুঝাই যায় না এটি নদীর পানি নাকি নর্দমার পানি। স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রার নীচে নেমে যাওয়ায় এই বিষাক্ত পানি মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, নষ্ট হয়েছে পানির গুনাগুন। ধলেশ্বর খাল এলাকার কিছু মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা বাধ্য হয়ে এই নদীর পানি ব্যবহার করছে। যার ফলে তাদের চর্ম রোগ, ডায়রিয়া, পেটের পীড়াসহ নানা রোগ হচ্ছে।

মানববন্ধন থেকে আমাদের দাবীঃ
১) অবিলম্বে শ্যামপুরের ডায়িং দূষণ বন্ধ করতে হবে।
২) উৎসে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত কল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
৩) ট্যানারীসহ সকল প্রকার শিল্প দূষণ স্থানান্তর নয়, স্থায়ী ভাবে বন্ধ করতে হবে।