শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমষ্টিগতভাবে সোচ্চার হতে হবে। শিশু অধিকার বিশেষ করে কন্যাশিশুর অধিকার বিষয়ে সরকার, বেসরকারী সংস্থাসহ সকলকে আইনের প্রয়োগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে একযোগে কাজ করতে হবে। মানুষের চাহিদা বাড়ার কারণে শিশু নির্যাতনের দু’চারটি ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে সরকার যথেষ্ট কাজ করছে। অতীতে এতো গণমাধ্যম না থাকায় নির্যাতনের খবর এত প্রচার হতো না। এখন গণমাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় যে কোন নির্যাতনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বাল্যবিবাহ সম্পর্কে ভিকটিমরা আজ সচেতন হয়ে উঠেছে। ফলে বাল্যবিবাহের কুফল ব্যাপকভাবে প্রচার পাচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতা এবং প্রতিরোধও গড়ে উঠছে। আজ ১২ অক্টোবর জাতীয় শিশু অধিকার সপ্তাহ ও কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস বিতর্ক প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি, এমপি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের যৌথ আয়োজনে রাজধানীর এফডিসিতে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি। এতে সার্বিক সহযোগিতা করেছে উইম্যান এন্ড গালর্স লীড গ্লোবাল ও হার চয়েজ।

প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি, এমপি বলেন প্রতিটি শিশুর জন্য সচেতন হতে হবে। আবার কেবল মেয়ে শিশুকে নয়, ছেলে শিশুকেও সচেতন করতে হবে। দেশে প্রচুর আইন আছে, ভাল ভাল আইন আছে, কিন্তু এ বিষয়ে জনসচেতনতা কম। আগে অভিভাবকরা তাদের শিশুরা নির্যাতিত হলে তা প্রকাশ করতো না। কিন্তু সময় বদলেছে। আবার অপরাধীরা সবসময়ই ওত পেতে থাকে এবং অপরাধের বিভিন্ন সুযোগ খোঁজে। তাই শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সমষ্টিগতভাবে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে এবং সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, পরিবারের নিজ শিশু সন্তানকে যেভাবে যতœ করা হয়, ঠিক সেভাবেই গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুটিকেও যতœ নিতে হবে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে শিশু নির্যাতনের হার ুঅনেক কমে আসবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এটি নিমূল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, শিশু নির্যাতন বন্ধে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরেও নির্যাতনের মাত্রা কমছে না। প্রতিদিনই নির্যাতিত, লাঞ্চিত শিশুদের সংবাদ আমরা শুনতে পাই। শিশু অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে সঠিক বিকাশ আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সর্বশেষ আমরা দেখেছি- পেটে বাতাস ঢুকিয়ে এবং মাছ চুরির অভিযোগে দু’জন শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুক কেন্দ্রীক গ্যাং স্টার, পাওয়ার বয়েজ, ডিস্কো বয়েজ নানা নামে শিশু কিশোর নির্যাতন হচ্ছে। সর্বশেষ মরণ ব্যাধি খেলা ব্লু হোয়েল গেম শিশুর মনোজগতকে ধ্বংস করার বার্তা দিচ্ছে। তাই শিশু কিশোরদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের প্রতি সদয় আচরণ করা উচিত। শ্রম ঘন্টা ও বেতন কাঠামো এখনো নির্ধারণ না করায় গৃহকর্মীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। যেসকল লাখো লাখো রোহিঙ্গা শিশুরা বাবা-মা হারিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে তাদের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রাপ্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।

জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি বলেন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি যার অর্ধেকই কন্যাশিশু। এসব কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে জনসচেতনতা যেমনি দরকার তেমনি আইনের কঠোর প্রয়োগও দরকার। সরকার ইতোমধ্যে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, পর্ণোগ্রাফি নিরোধ আইন প্রভৃতি প্রণয়ন করেছে। এখন দরকার সবাই মিলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মানসিকতা বদলে ফেলে সুন্দর ও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়া।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে সংসদীয় পদ্ধতিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ওয়াই ডব্লিউ সি এ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজকে পরাজিত করে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু রইস, সাংবাদিক মাইনুল আলম, সেলিনা তাওহিদ, ও ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়।