বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট, ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট ও সুন্দর জীবন এর উদ্যোগে আজ ২৬ জানুয়ারী ২০১৮, শুক্রবার, সকাল ১০.৩০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গোলটেবিল কক্ষে “শব্দ দূষণ এখন জীবন-বিনাশী শব্দ সন্ত্রাস; গভীর সংকটে আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য! সমাধানের উপায় কী ?” শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও বাতাস-শব্দ দূষণ কর্মসূচীর সদস্য সচিব এম সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। এতে নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর সভাপতি ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম আবু সাঈদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়াক সার্জারী বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক বুলবুল, শব্দ দূষণ বিষয়ক গবেষক এবং হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন, বাপা’র যুগ্মসম্পাদক মিহির বিশ্বাস, এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এর উপ ব্যবস্থাপক অমিত রঞ্জন দে এবং ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হোসেন।

ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, প্রতিনিয়ত মারাত্মকভাবে বেড়ে চলেছে শব্দদূষণ। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাপাসহ বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলন ও দাবীর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন প্রনয়ণ করে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এই আইনের কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, পরিবেশের যে কোন সংকট সমাধানে সরকারের আগ্রহ সব সময়ই কম। জনগন স্বোচ্ছার হলে ঐ সময়ে পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির অথবা নিজেদের স্বার্থে আইনের বাস্তবায়ন করতে তাদের অনীহা লক্ষ্য করা যায়। আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের দৈনতা খুবই দুঃখজনক। তিনি আইন বাস্তবায়নে সরকারকে নীতিনিষ্ঠ ও আন্তরিক হওয়ার আহবান জানান। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও উচ্চ শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রনে আনা যায় কিনা তা বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহবান জানান।

এম সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ দেশব্যাপী সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ শব্দদূষণ এবং এর ফলে বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে কমবেশি সবাই অবগত। এই দূষণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে এখন সাংবাদিক এবং ভুক্তভোগী মহল শব্দ-সন্ত্রাস নামে অভিহিত করছে। এর সুস্পষ্ট কারণও রয়েছে। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের একটি ফ্লাটে শব্দ-সন্ত্রাসীদের দ্বারা এক ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছে। শব্দ-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়েই তাঁর এই করুণ মৃত্যু। এই ঘটনায় আমাদেরকে ব্যথিত করেছে, যা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে তা মানুষের সহ্য সীমা অতিক্রম করছে এবং এ কারণেই মানুষ কিছুটা প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, কিন্তু ফলে তারা হচ্ছে অপদস্থ। আর অপদস্থ হওয়ার ভয়ে বেশিরভাগ মানুষই শব্দ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ না করে বরং নির্বিবাদে এই ভয়ংকর যন্ত্রণা সহ্য করেই যাচ্ছে। শব্দদূষণের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে বলেন জনগন এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায়। এজন্য বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নসহ শব্দ দূষণ রোধে তিনি ১৪ টি সুপারিশ ও দাবী তুলে ধরেন।

অধ্যাপক এম আবু সাঈদ, শব্দদূষণ বিষয়ে জনগনকে সচেতন হওয়ার আহবান জানান। পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে শব্দদূষণ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহবান জানান।

অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক বুলবুল বলেন, শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবে রক্তচাপ বেড়ে যায়, হৃদযন্ত্রের ক¤পন বেড়ে যায়। তাছাড়া রাস্তার পাশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসারত রোগীরা ঝুঁকিতে থাকে। তাই হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক এলাকার শব্দদূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করার জন্য তিনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি আহবান জানান।

ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন, কয়েকটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলেন অনুমোদিত শব্দের মাত্রার চেয়ে কোন কোন স্থানে দেড়গুন বা দুইগুন বেশী ছাড়িয়ে যাচ্ছে এই মাত্রা। তাই শব্দদূষণ প্রতিরোধে আমাদেরকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

মিহির বিশ্বাস বলেন, শুধুমাত্র কথা বা প্রতিশ্রুতি নয় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের সময় এখনই। যে কোন ভাবে এটি নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

 

অমিত রঞ্জন দে বলেন, শব্দদূষণের ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা, মানসিক বিকাশ ও মনসংযোগে বিঘœ সৃষ্টি করছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিকতা, অস্থিরতা ও উগ্রভাব অনেকাংশে শব্দদূষণের জন্য দায়ী। শব্দদূষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও ট্রাফিক পুলিশকে প্রশিক্ষণ প্রদানের আহবান জানান।

মারুফ হোসেন বলেন, আইনের বাস্তবায়ন থাকলে গোপীবাগের মত এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটতো না। আইনে মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য শব্দ মাত্রা ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ আছে, কিন্তু কেউ তা মানছে না। তাই এটি মানা ও বাস্তবায়নের জন্য ভ্রাম্যমান আদালত, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে ও আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বিধিমালাটির বিষয়ে ব্যাপক প্রচারনার আহবান জানান তিনি।

শব্দদূষণের এই ভয়াবহতা রোধকল্পে উল্লিখিত সংগঠনমূহের পক্ষ থেকে নি¤œলিখিত দাবীসমূহ উত্থাপন করা হয়ঃ
১) ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২) আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে মোবাইল টিম গঠন করে শব্দ সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩) প্রতিদিন দুই/চারজনকে ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে যেমনটি করা হয়েছিলো শব্দদূষণ বিধিমালা জারি করার পর শাহবাগ থেকে ক্যান্টনমেন্টের থার্ড গেট পর্যন্তু রাস্তায়।
৪) রাতের বেলায় আবাসিক এলাকায় শব্দ সৃষ্টিকারী নির্মাণকাজসহ যে কোনো ধরনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।
৫) আবাসিক এলাকার গলির মধ্যে ট্রাক প্রবেশ, হর্ণ বাজানো এবং শব্দদূষণ সৃষ্টি করে মালামাল ওঠানো-নামানো বন্ধ রাখতে হবে। বড় রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয় মাল-জিনিস নামিয়ে সেখান থেকে দিনের বেলায় ঠেলা গাড়ি দিয়ে আবাসিক এলাকায় নিতে হবে।
৬) কোনো গাড়ীতেই যেন হাইড্রলিক হর্ণ না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিনা কারনে হর্ণ বাজানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭) সরকারি, আধা-সরকারি এবং শায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ড্রাইভারের প্রতি সু¯পষ্ট কারণ ব্যাতীত গাড়ীর হর্ণ না বাজানোর সরকারি নির্দেশ জারি করতে হবে এবং ড্রাইভারগণ যাতে এ-নির্দেশ পালন করে সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য সমস্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করতে হবে।
৮) ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী ¯কুলসমূহের প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করতে হবে যাতে হর্ণ বাজানো ছাড়া কীভাবে গাড়ী চালাতে হয় সেব্যাপারে তারা সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
৯) আবাসিক এলাকায় কোনোভাবেই যাতে ইট ভাংগার মেশিন ব্যবহার না করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
১০) ভ্যানগাড়িতে মাইক দ্বারা প্রচার চালিয়ে পন্য এবং লটারির টিকিট বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
১১) সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিও এবং টেলিভিশনে প্রধান প্রধান খবরের আগে শব্দদূষণের ক্ষতিকর বিষয়সমূহ তুলে ধরে এর বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব স¤পর্কেও তাদেরকে সচেতন করতে হবে।
১২) বেসরকারি রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও যাতে অনুরুপ প্রচারণা চালায় সে ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে তাদের প্রতি সু¯পষ্ট আহবান থাকতে হবে।
১৩) সরকারি উদ্যোগে একটি বিশেষ দিন ধার্য করে সেটিকে ‘হর্ণবিহীন দিবস’ বা ইংরেজীতে ‘নো হংকিং ডে’ হিসেবে পালন করতে হবে। এতে হর্ণ বাজানোর প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে।
১৪) প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ‘পরিবেশ রক্ষা ও শব্দ দূষণ প্রতিরোধে নাগরিক কমিটি’ গঠন করতে হবে।