ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর উদ্যোগে আজ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, বেলা ১২.০০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি হল কক্ষে “মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা ২০১৭ ঃ স্বচ্ছতা ও করণীয়” শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুল বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. এম আবু সাঈদ। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আফসানা করিম, যুগ্মসম্পাদক ডা. আব্দুল খালেক ও ডা. দেলোয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক বুলবুল ও ডা. গোলাম আযম।

মুল বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এম আবু সাঈদ বলেন, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতার উপর নির্ভর করছে চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসা পেশা এবং বহুলাংশে দেশের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের অংশ হিসাবে লাগামহীনভাবে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এমতাবস্থায় কিছু কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে সিট যাতে ফাঁকা পড়ে না থাকে সেটা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রশ্ন সহজ করা, মূল্যায়ান পদ্ধতি পরিবর্তন, প্রশ্ন ফাঁস, মূল্যায়নে কারচুপি ইত্যাদি নানাবিধ অপচেস্টার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। পূর্বে খুব সীমিত আকারে পরীক্ষা পদ্ধতিতে দুর্নীতি থাকলেও ১৯৯০ সালের পর থেকে তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ইদানিংকালে একটা মারাত্মক সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে (ব্যতিক্রম ২০১৬ সালের ভর্তি পরীক্ষা)। শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের যে কার্যক্রম চলছে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষাও তার বাইরে নয়। এখন সরকারী মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ২৯, আসন সংখ্যা ৩১৬২, ডেন্টাল কলেজের সংখ্যা ১, ডেন্টাল ইউনিটের সংখ্যা ৯ এবং আসন সংখ্যা ৫৩২, অপরদিকে বেসরকারি খাতে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ৬৪, আসন সংখ্যা ৫৩২৫, ডেন্টাল ইউনিট এবং কলেজের সংখ্যা ২৪, আসন সংখ্যা ১২৮০। সহজেই অনুমেয় যে, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোই এখন মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থায় নানাবিধ কারণে প্রাধান্য পাচ্ছে, এবং মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা তাদের অনুকূলেই প্রভাবিত হচ্ছে।

তিনি ২০১৫ সালের বিতর্কিত ভর্তি পরীক্ষা ও তখনকার পরিস্থিতি এবং পরবর্তীতে এবিষয়ে গঠিত গণতদন্ত কমিটির সুপারিশসহ মেডিক্যাল ভর্তি ও মেডিক্যাল শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলন থেকে নিন্মোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ তুলে ধরা হয়ঃ

১। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত করে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা গ্রহনের দায়িত্ব কর্মজীবনে সন্দেহাতীতভাবে নীতিনীষ্ঠ মেডিক্যাল শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি ‘মেডিক্যাল শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে তাদের উপর অর্পণ করতে হবে। এই কমিশন পরীক্ষার সামগ্রিক কাজ পরিচালনা করবে এবং তার দায়দায়িত্ব বহন করবে। মেডিক্যাল শিক্ষা কমিশনকে পরীক্ষার সময়ে ১ মাসের জন্য ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের ক্ষমতা দিতে হবে।
২। মোট আসন সংখ্যার (সরকারী ও বেসরকারী) ৩ থেকে ৫ গুন প্রার্থী এসএসসি ও এইচএসসি -তে প্রাপ্ত নাম্বার অথবা বায়োলজী, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন এবং ইংরেজীতে প্রাপ্ত নাম্বারের ভিত্তিতে প্রাথমিক ভাবে বাছাই করা হবে, প্রাথমিক বাছাইয়ের ভার সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশন (সিএমই) এর উপর অর্পিত হবে।
৩। বাছাইকৃত ছাত্র-ছাত্রীরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিবে, বিষয় থাকবে বায়োলজি, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ইংরেজি, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক জ্ঞান। এছাড়া ২০ নাম্বারের মনস্তাত্বিক পরীক্ষা কম্পিউটারের মাধ্যমে আলাদাভাবে নেওয়া যেতে পারে মানসিকতা নির্ধারণের জন্য।

৪। মেধা তালিকার ফল ক্রমানুসারে একই সঙ্গে পত্রিকা এবং ওয়েব সাইটে প্রকাশ করতে হবে।

 

৫। সরকারী এবং বেসরকারী সবক্ষেত্রে ৯৫% মেধা তালিকা অনুযায়ী এবং অবশিষ্ট ৫% পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভিতর মেধার ভিত্তিতে বণ্টন করা যেতে পারে। যোগ্যতার জন্য ন্যূনতম নাম্বার তাকে পেতেই হবে।
৬। গণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রকাশ ও প্রচার নিয়ন্ত্রনে কঠোরতর নতুন বিধি/ প্রবিধি প্রণয়ন করতে হবে। আইনগুলোর সঠিক এবং যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৭। বিদেশী কোটায় দেশী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক ক্রম অনুসরণ করতে হবে। বিদেশী কোটার হার ২০% এর উর্দ্ধে রাখা যাবে না এবং বিদেশী শিক্ষার্থীর প্রাক ভর্তির যোগ্যতা আরও সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। শূন্য আসনে দেশী শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আইন সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
৮। প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে যাতে কোচিং সেন্টারের ভূমিকা পালনের কোন সুযোগ না থাকে এবং প্রকৃত মেধাবীরাই যাতে সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ভর্তি কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে হবে।
৯। নির্ধারিত পাশ মার্কের কম নাম্বারপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীকে কোন ক্রমেই ভর্তি করা যাবে না।

১০। ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলে ফলাফল স্থগিত করে দ্রুত তদন্ত করে তা প্রকাশ করতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১১। সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন একটি ‘শিক্ষা অধিকার কমিশন’ গঠন করতে হবে। এই কমিশন ভর্তি পরীক্ষাসহ শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
১২। বিভাগীয় শহরের মেডিক্যাল কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে।
১৩। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কমপক্ষে তিন সেট রাখতে হবে এবং পরীক্ষার ১ ঘন্টা আগে ম্যাসেজের মাধ্যমে কোন প্রশ্নপত্রের সেটে পরীক্ষা হবে, তা কেন্দ্রে জানিয়ে দেয়া যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তাগন জানান, আমরা গতবছরও এই সুপারিশমালাসমূহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করি। আমরা সাধুবাদ জানাই, আমাদের বেশ কিছু সুপারিশ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে এবং গত বছরের পরীক্ষা বহুলাংশে গ্রহনযোগ্য ও স্বচ্ছ হয়। আমরা চাই এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আসন্ন ভর্তি পরীক্ষাসহ ভবিষ্যতে ভর্তি পরীক্ষা যেন আরো স্বচ্ছ হয় এবং আমাদের প্রস্তাবিত যে সকল প্রস্তাবনা গ্রহন করা হয়নি সেগুলোও যেন গ্রহণ করা হয়।

বক্তাগন বলেন, আমরা অবগত আছি যে, সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি আরো তিনটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মত ‘‘মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’’ গঠন করতে হবে এবং মেডিক্যাল ও ডেন্টালের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত করতে হবে।