রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার খাল। রাজধানীর মানচিত্র থেকে গত ৪৬ বছরে ৪৭টি খাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ১৫টির মধ্যে মাত্র চারটির অংশ লেক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অন্যগুলো ভরাট-দখলে সঙ্কুচিত হয়ে নর্দমার আকৃতি পেয়েছে। বৃষ্টির পানি সরতে না পারায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগর জুড়ে মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে জনজীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, সমন্বয়হীনতা ও খালগুলো দখলের কারণেই ঢাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে তারা খাল উদ্ধার ও তা খননের ওপর বিশেষ জোর দেন।

ঢাকা ওয়াসার হিসেবেই রাজধানীতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ৫৪টি খালের অস্তিত্ব ছিল। ১৯৮১ সালে এর সংখ্যা ৪৭টিতে নেমে আসে। বর্তমানে ঢাকায় ২৬টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও বেশির ভাগই অস্তিত্ব সংকটে। সিংহভাগ খাল দখল করে বাড়িঘর ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

এককালে নগরীর মধ্যদিয়ে প্রবহমান বেশির ভাগ খালের সংযোগ ছিল রাজধানী লাগোয়া প্রধান চারটি নদীর সঙ্গে। যেমন সূত্রাপুর লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বসিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরার আবদুল্লাহপুর হয়ে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযোগ ছিল খালগুলোর। সেসবই এখন বিস্মৃত অতীত মাত্র।

হারিয়ে গেছে ঢাকার বিখ্যাত সেই ধোলাইখাল। একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে কুতুবখালী খালের। আবদুল্লাহপুর খালটি রাস্তা ও রাজউকের প্লটের কারণে এরই মধ্যে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে এখন ছোট ছোট নালায় পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের মাণ্ডা খাল এলাকার পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে দখল-দূষণে অনেক আগেই সঙ্কুচিত হওয়া খালটি এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বসিলা খাল ও খাল সংলগ্ন জলাশয় এবং বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড় ভূমিদস্যুরা ইতোমধ্যে দখল-ভরাট করে নিয়েছে।

এক যুগ আগেও শাহবাগ থেকে বড় মগবাজার পর্যন্ত পরীবাগ খাল, বিজয়নগর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত আরামবাগ খাল ছিল। সময়ের ব্যবধানে খালগুলো সড়কে পরিণত হয়েছে। রাজাবাজার খাল, ধোলাইখাল-১, ধোলাইখাল-২, শাহজাহানপুর খাল, গুলশান-বনানী খাল, দক্ষিণগাঁও-নন্দীপাড়া খাল, রাজারবাগ-নন্দীপাড়া খাল, নাসিরাবাদ-নন্দীপাড়া খাল, নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী খাল, বাউখার খাল এবং গোবিন্দপুর খাল সেগুনবাগিচা খাল এখন অস্তিত্বহীন।

উত্তরা আবাসিক এলাকা থেকে উত্তরখানের ভিতর দিয়ে টঙ্গী খালে গিয়ে পড়া কসাইবাড়ি খালটি বর্তমানে ড্রেনে রূপান্তর হয়েছে। মিরপুর সাংবাদিক কলোনি খাল, মহাখালী খাল, বাসাবো খাল, কল্যাণপুর খালগুলো নালায় পরিণত হয়েছে। মেরাদিয়া ও গজারিয়া খাল এখন জীর্ণ নালা। খাল দখল ও ভরাট করে খালখেকোরা তা প্লট বানিয়ে বিক্রি করছে। খাল উদ্ধারের নামে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ছোট-বড় অনেক অভিযান চালালেও কোনো কাজ হয়নি।

খাল উদ্ধার সম্পর্কে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার সমন্বয়হীনতা এবং খালগুলো দখলের কারণেই ঢাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে খাল উদ্ধার ও তা খননের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, ধোলাইখাল, ডিএনডি খালসহ বহু খাল আজ  নিশ্চিহ্নপ্রায়। নিকুঞ্জের চারপাশে যে পরিখা নির্মাণ করা হয়েছিল, সংরক্ষণের অভাবে তা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। খাল উদ্ধারে ব্যর্থ হলে জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হবে ঢাকা শহর। খাল উদ্ধার সরকারের এক নম্বর এজেন্ডা হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, রাজধানীতে জলাবদ্ধতার মূল কারণ প্রবহমান খালগুলো বেদখল হয়ে যাওয়া। বেদখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যেই একাধিক খালও উদ্ধার করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এই অভিযান চলবে।