বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার, ঢাকা ইয়ুথ ক্লাব, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, ঢাকা ওমেন্স ক্লাব ও পুরাণ ঢাকা মঞ্চ -এর যৌথ উদ্যোগে আজ ১৭ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার, সকাল ১১টায় শাহাবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে “বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর অব্যাহত দূষণ রোধ ও স্থানান্তরিত ট্যানারী শিল্প স্থাপন দ্রুত সম্পন্ন করার দাবীতে” এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন এর সভাপতিত্বে এবং ঢাকা ইয়ুথ ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের সাধারণ সম্পাদক সোহাগ মহাজন এর সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ও বাপা’র সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলহাজ্ব মোঃ হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। এতে বক্তব্য রাখেন বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়ক মিহির বিশ্বাস, বাপা’র যুগ্মসম্পাদক মোঃ শাহজাহান মৃধা, এম. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, মোঃ আলমগীর কবির ও হুমায়ন কবির সুমন, বাপা’র জাতীয় পরিষদ সদস্য নাজিম উদ্দিন ও এবিএম আনিসুজ্জামান, ঢাকা ওমেন্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিলি রহমান, মর্ডান ক্লাবের সভাপতি আবুল হাসনাত, ঢাকা ফাউন্ডেশনের সভাপতি হাজী মনির হোসেন মিন্টু, পুরান ঢাকা মঞ্চের যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক প্রমুখ। এছাড়াও কর্মসূচীতে অন্যান্য পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, ছাত্র-ছাত্রীসহ নদী পাড়ের জনগন অংশগ্রহন করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, দীর্ঘ দুই দশক যাবত বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্তসহ ঢাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হাজারীবাগ ট্যানারী শিল্প সরিয়ে নেয়ার দাবীর প্রেক্ষিতে গত বছর থেকে সাভারে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো তা পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। আমরা কয়েকবার সরেজমিনে পরিদর্শণে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত মন্থর। ট্যানারী শিল্প স্থানান্তর বিলম্বের মুল কারণ সরকারের কাজের ধীর গতি ও মালিকদের গাফিলতি। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীকে আমরা দূষণমুক্ত দেখতে চাই। পাশাপাশি ৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিল্প যাতে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় সেটিও আমরা চাই। তিনি আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ট্যানারী শিল্প গড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত।

আলহাজ্ব মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, চারপাশ নদী দ্বারা বেষ্টিত রাজধানী ঢাকাকে একটি অনন্য নান্দনিক শহর হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা যেত। অথচ ব্যাপক দখল-দূষণের কবলে আজ এই নদীগুলো বিপর্যস্ত। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দীর্ঘ সংগ্রাম করে এদেশ স্বাধীন করেছি। স্বাধীনোত্তর এই দেশে নদীগুলো রক্ষা করা যাবে না, তা হতে পারে না। নদী রক্ষায় আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন হতে হবে। তিনি সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারী শিল্প নগরীতে কার্যকর ইটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার আহবান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন যে, সাভারে ট্যানারীর নামে “মারাতœক দূষণ” স্থানান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারী প্রতিষ্ঠান বিসিক সঠিক পরিকল্পনা করেনি ও কাজের অগ্রগতি নিয়েও ভুল তথ্য দিয়েছে। ট্যানরিী মালিকরাও ইচ্ছাকৃতভাবে অবকাঠামো নকশা জমা দিতে দেরী করেছে। তিনি সভার পক্ষ থেকে নিন্মোক্ত দাবীসমূহ তুলে ধরেনঃ (১). অবিলম্বে ট্যানারী বর্জ্য থেকে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী দূষণ যথাযথভাবে বন্ধ করতে হবে; (২) ট্যানারী স্থানান্তরে বিলম্ব, অসম্পূর্ন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার কারণ চিহ্নিত করে তা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে; (৩) হাজারীবাগে রয়ে যাওয়া অবশিষ্ট সকল ট্যানারী প্লান্ট অবিলম্বে সাভারে সরিয়ে নিতে হবে, (৪). ট্যানারী শ্রমিক-কর্মচারীদের সাভারে আসা-যাওয়া/বসবাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, (৫). দেশের সকল নদী ও জলাশয় দূষণ বন্ধে সকল শিল্প কারখানার উৎসে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

মানববন্ধনে অন্যান্য বক্তাগন বলেন, ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয় প্রায় দুই দশক আগে, কিন্তু বিভিন্ন সময় স্থানান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকের অব্যাহত আন্দোলন ও দাবীর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে হাজারীবাগের ট্যানারী সাভারে স্থানান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এর সুফল এখনো আসেনি। পরিবেশবান্ধব ট্যানারী শিল্পনগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাভারের ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ২০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত এলাকায় ১৫৫টি ট্যানারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্লট বিতরণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্লট বরাদ্ধ পাওয়া ট্যানারী কোম্পানীর সিংহভাগই তাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ সুবিধাই সেখানে অপ্রতুল্য, সরকার ঘোষিত অনেকগুলো কার্যক্রম বাস্তবে এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ২২ বছর কেটে গেছে শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহন, আইনি জটিলতা ও গাফিলতির জন্য। আমরা এটি আর দেখতে চাই না। যে ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো রয়েছে তা সমাধান ও কারিগরী দক্ষতা বৃদ্ধি করে স্থানান্তরিত ট্যানারী শিল্প স্থাপন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।