বাংলাদেশ পরিব্শে আন্দোলন (বাপা)-র উদ্যোগে আজ ৯ অগাস্ট ২০১৭, বুধবার, সকাল ১০.৩০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গোলটেবিল কক্ষে ‘‘বারংবার জলজটে জনদূর্ভোগ ঃ প্রতিকারের উপায় কি?’’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন এর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে এবিষয়ে মুল বক্তব্য রাখেন বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও নগরায়ন-সুশাসন কর্মসূচীর সদস্য সচিব স্থপতি ইকবাল হাবিব। এতে আরো বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বাপা’র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মহিদুল হক খান, নির্বাহী সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাপা’র যুগ্মসম্পাদক আলমগীর কবির ও হুমায়ন কবির সুমন উপস্থিত ছিলেন।

মুল বক্তব্যে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের নগরায়নের চালচিত্র ও করণীয় বিবেচনায় অদূর ভবিষ্যতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনঘনত্বের শহর রাজধানী ঢাকা সবচেয়ে উপযোগী উদাহরণ। চারদিকে নদীবেষ্টিত মহানগরী ঢাকার সমস্ত দেহজুড়ে ছড়িয়ে থাকা খাল-লেক আর জলাশয়গুলো দ্রুত বর্ধিষ্ণু শহরটিকে নিষ্কাশিত করছিল দীর্ঘদিন ধরে, বিকশিত করছিল এর জনজীবনকে। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর চাপ, আর অতি মুনাফালোভী ভূমি দুর্বৃত্তদের প্রবল পরাক্রমের কাছে হারিয়ে গেছে এর অনেকটাই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত ব্যবস্থা আর উন্নয়নের নামে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ‘উন্নয়ন স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ফলে খাল হয়েছে কালভার্ট, লেক হয়েছে বসতি, গাছ হয়েছে জ্বালানী। আজ তাই প্রতি বর্ষায় নগরবাসীর নাকাল অবস্থা। জলজটে শহরের স্বাভাবিক কর্মকা- বিপর্যস্ত। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গেচুরে হয়েছে একাকার আর সেই সাথে পূতিময় দুর্গন্ধযুক্ত পয়ঃমিশ্রিত জল উঠে আসছে রাস্তা ঘাটে, যখন তখন এক পশলা বৃষ্টিতেই। এখন নগরীতে খাবারের পানিসহ সব জলাধার আর লেকের জলে দূষণের মাত্রা এখন তাই অসহনীয় পর্যায়ে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যেও তা হুমকিস্বরূপ। এই প্রেক্ষাপটটি অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত, পর্যালোচিত। অনেক পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি আর সিদ্ধান্তও আছে এই অবস্থাটি ঘিরে। তারপরও অবস্থার অবনতি বৈ উন্নতি হয়নি, হচ্ছেও না। মূলতঃ ‘ডেভলাপারদের’ মধ্যেকার বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব ও প্রতিপত্তি; সরকারের কার্যকর, সমন্বিত, সার্বিকতা ও সময় নির্ভর পদক্ষেপ গ্রহণে অনীহা; পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততার ও জবাবদিহিতার অভাব; দখলকৃত এসব খাল, নদী-জলাশয় পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে কাঠামোগত ব্যর্থতা, সেই অর্থে দায়িত্বহীনতা, ইত্যাদি কার্যকারণের পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাবও এর জন্যে দায়ী। যথাযথ নগর উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নে রয়েছে দায়িত্বহীন কর্মকা-। তিনি এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে বলেন, এখন তাই প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে করে এ ধরণের কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততাকে বাধ্যতামূলক করা যায় এবং তা পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কার্যকর হয়। জন-গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিবেশ বিষয়ে আশু-করণীয় দাবীসমূহ নিয়ে এই সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা বাপা তাই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও কমিটির মাধ্যমে উপস্থাপন পর্যালোচনা ও যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিল। এবারের আগাম ও ঘন ঘন বর্ষণের প্রেক্ষাপটে নগরীর এই সমস্যা প্রায় জটিল ও সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। এখন মাঝারী বা হালকা মাঝারী বৃষ্টিপাতেই বিভিন্ন অঞ্চলের তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সৃষ্টি হচ্ছে জলজট, যানজট আর রেখে যাচ্ছে চলাচলের অনুপযুক্ত সড়ক কাঠামো ॥ কখনও কখনও কোথাও কোথাও “স্থানিক” জলাবদ্ধতারও সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে জনদুর্ভোগের শিকার বিশাল জনগোষ্ঠির স্বার্থের কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে নিন্মোক্ত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সক্রিয় কর্মধারার উদ্যোগ গ্রহনের দাবী জানান তিনি। দাবীগুলো হলোঃ
১) একটি সময় নির্ভর, সার্বিকতাপূর্ণ ও সমন্বিত কর্মধারার ড্রেনেজ ও জল নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করার আশু উদ্যোগ জরুরী। এ ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনকে মূল দায়িত্ব অর্পণের পাশাপাশি ‘ঢাকা ওয়াসার’ ড্রেনেজ ডিভিশনকে কারিগরী লোকবল ও বাজেটসহ সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করার পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের’ কারিগরী সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদ্যোগী মন্ত্রণালয় হিসেবে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে।

২) উপরোক্ত ‘রোড ম্যাপ’ বা ‘মহাপরিকল্পনার প্রণয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনকে (ক) জরুরী ভিত্তিতে জল নিষ্কাশনের ‘স্থানিক’ সমস্যাগুলো নিরসনে কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে (খ) পাশাপাশি ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয় সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে যাতে জনগণ বা অন্য কোন সংস্থা কর্তৃক খাল-জলাধার বা নালা-ড্রেনেজ ভরাট প্রক্রিয়া রহিত হয় (গ) অঞ্চল ভিত্তিক ‘কাউন্সিলার’ আর রাজনৈতিক কর্মী দ্বারা জনসংযোগ তথা জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে উদ্যোগগুলোকে ‘জন আন্দোলন’ রূপান্তরে সচেষ্ট হতে হবে।

৩) সমন্বিত ‘রোড ম্যাপ’ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজউককে দ্রুত ও কঠোর ভাবে ‘সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা’ বা ‘জউঅচ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিকল্পিত জলাধার, নি¤œাঞ্চল আর প্লাবন ভূমি পুনঃরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে।

 

সেই সাথে প্রতিটি প্লটে আইনানুগ ২৫% উন্মুক্ত স্থান পুনঃরুদ্ধার করার মধ্যে দিয়ে মাটি অভ্যন্তরে জল পুনঃভরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ‘জঁহ ড়ভভ ধিঃবৎ’ বা ‘গড়িয়ে যাওয়া জলের’ পরিমাণ বর্তমানের প্রায় ৯০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়। এছাড়া সকল ‘বৃহদায়তন প্রকল্প’ সমূহে বাধ্যতামূলক ‘বৃষ্টির জল পুনঃভরণ’ কূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ জলের প্রবাহ বৃদ্ধির কঠোর অনুশাষণ আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি ‘বৃষ্টির জল সংরক্ষণে ও ব্যবহারে’ সকলকে উৎসাহিত করার ব্যপারে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪) পাশাপাশি জেলা প্রশাসনকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সি,এস, ম্যাপ অনুযায়ী প্রকৃতিগত খালগুলোর ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে একে সচল রাখার নিমিত্তে সকল দখল অপসারণ করে স্থায়ী সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে এর তলার বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা নিয়ে এগুলো পানি ধারণ ক্ষমতাও ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই সাথে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়া খালগুলোর বাস্তবতায় আশু ‘সংযোগ খাল’ তৈরী করে একটি কার্যকর ও সক্ষম নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা নেটওয়ার্ক তৈরী করতে হবে। এ কার্যক্রমে পশ্চিমের বাঁধকে ‘নগর বন্যার’ ক্ষেত্রে জল চলাচলের প্রতিবন্ধকতার বর্তমান অবস্থানকে পুর্নবিবেচনায় নিয়ে যথাযথকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এই কার্যক্রমটি একটি সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভব যাতে গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় অধীনস্থ ‘রাজউক, ভূমি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ওয়াসাকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

৫) ঢাকার পশ্চিম ও দক্ষিণে এবং ডি,এন্ড,ডি অঞ্চলে ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড’ কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত ‘বারিপাত ধারণ অঞ্চল’ দখলমুক্ত করার পাশাপাশি ‘পাম্প এর মাধ্যমে নিষ্কাশনের’ সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে দ্রুততম সময় জল নিষ্কাশন সক্ষমতা দিয়ে অন্ততঃ মাঝারি বর্ষণের জলাবদ্ধতা বা জলজটকে মোকাবেলা করা যায়।

এছাড়াও তিনি এই সকল দাবীগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ ও জরুরী জন গুরুত্বপূর্ণ নি¤œলিখিত দু’টি দাবী বিষয়ে গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইতিমধ্যে গঠিত ‘নগর-কমিটি’র তত্ত্বাবধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বলে মত দেন;

ক) সকল অননুমোদিত বেসরকারী হাউজিং প্রকল্পের কার্যক্রম ও বিজ্ঞাপন প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করা হউক। এতদ্সংগে সরকারী খাস জমি, নদী-খাল-লেক-জলাশয় প্রভৃতির অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও উদ্ধারকৃত ভূমির সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। রাজউক কর্তৃক সংবাদ মাধ্যমে অবৈধ সকল প্রকল্প সমূহের তালিকা ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থাসহ সকল বেসরকারী হাউজিং প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে রাজউকের/সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা।

খ) ‘রাজউকে’র সার্বিক পুনর্ঃগঠন প্রক্রিয়ার অধীনে আইনগত, কাঠামোগত ও জনদক্ষতার ক্ষেত্রে আশু ব্যবস্থা মাধ্যমে এর পরিচালনায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে জনমুখী ও জবাবদিহিতামূলক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ড. আকতার মাহমুদ বলেন, এবারের ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা ও জনদূর্ভোগের ঘটনা সাধারণ জনগনসহ সকল মহলকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। মাত্র ৪০ মি.মি বৃষ্টিতে যেভাবে ঢাকা মহানগরী ব্যাপক জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, ১৯৬২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ মাষ্টার প্ল্যান নিয়ে ৫ বার ষ্টাডি হয়েছে, অনেক পরিকল্পনা হয়েছে। তবে এসবের বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন জরুরী। এজন্য মহানগরীর বৃষ্টি পানি দ্রুত সরে যেতে নদী পথ পর্যন্ত ড্রেনেজের পুরো চ্যানেল যাতে বাধামুক্ত থাকে তা নিশ্চিত করা ও নিয়মিত তদারকি করতে হবে।; ঢাকা মহানগরীর ৫০টি খালের মধ্যে প্রধান প্রধান খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে।; এবং ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ড্রেনেজ প্ল্যান প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের আহবান জানান।

ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, আমরা প্রায় দেড় যুগ সময় ধরে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার কারণ এবং এর করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন সময় বলে আসলেও আজও কার্যকর কিছু হচ্ছে না। যার কারণে প্রতি বর্ষা মৌসুমে মহানগরবাসীদের ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই, শুধুমাত্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেই তৎপরতা না বাড়িয়ে, এজন্য একটি কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান করা হোক। আমরা আশা করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় পদক্ষেপে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে।