মোঃ ইউনুস আলী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

প্রতিবছরে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যায় হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি, বসতভিটা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও পুকুরের মাছ। পানিতে তলিয়ে যায় হাজার হাজার হেক্টর জমির আবাদি ফসল। পানি বন্ধী হয়ে পড়েন লক্ষলক্ষ মানুষ। এতে তাদের যেন দুঃখ দুর্দশার শেষ নেই। নদীর একুল গড়ে তো অকুল ভাঙ্গে। এই তো তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনে ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

সরকারের উদাসীনতা আর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের অবহেলা আজ তিস্তা পাড়ের মানুষ গুলো হয়ে পড়েছে শহীদ কারবালার যুদ্ধের জীবনবাজী সংগ্রামী সৈনিক। কখন কার কষ্টের গচ্ছিত সম্পদ, বসতবাড়ি, জীবন যৌবন চলে যাবে তার কোন নিশ্চয়তাই নেই।

অথচ তিস্তা নদীর বামতীরে একটি শক্তিশালী বাধ নির্মাণ করলেই এই হতভাগা মানুষেরা একটু বাঁচার স্বপ্ন দেখত। চরাঞ্চলে ভুট্রা, ধান-গম, পিয়াজ, রসুন, আলু, সবজি চাষ করে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল করে তুলতে পারে বলে সুধীজনেরা মনে করেন।

প্রতিবছরে বন্যা এলে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা ছুটে আসেন বন্যার্তদের একটু ত্রাণ তিয়ে মিডিয়ার শিরনাম হতে কিন্তু এই বন্যার্ত মানুষ গুলোর স্থায়ী সুখদুঃখ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো যেন তাদের সময়েই নেই।

এর বাহিরেই রয়েছে বন্যার্ত অসহায় মানুষ গুলোকে নিয়ে রাজনৈতি প্রতি হিংসা। গত জাতীয় নির্বাচনে লালমনিরহাট -১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি আলহাজ্ব হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদকে আকাশপাতাল ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত করে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আ’লীগের মোতাহার হোসেন এমপি। ঐ নির্বাচনে এরশাদ সাহেব মাত্র ৫ হাজারের মতো ভোট পেয়েছিলেন। আর এই সরকারে আমলেই পানি সম্পৎ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হতে জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম।

লালমনিরহাট -১ আসনে এরশাদের সেই পরাজয় যেন কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না পানি মন্ত্রী আনিছুল ইসলাম। তাই তার দায়িত্ব পাওয়ায় পর থেকে অদ্যাবধি একটি টাকাও বাধ নির্মাণ কাজে তিনি বরাদ্দ দেননি।

এছাড়াও ঐ মন্ত্রী কোনো কারন ছাড়াই তিস্তা ব্যারেজের উপর দিয়ে মাঝারি এবং বড় যান বাহন চলাচল বন্দ করে দিয়েছে অনেকেই দাবি করেন।

এদিকে তিস্তা ব্যারেজের উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হবার পর লালমনিরহাট – বুড়িমারী মহাসড়ক দিয়ে তা চলাচল করায় প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেই চলেছে। তারপর থেকে এযাবত সড়ক দুর্ঘটনা কয়েকশত নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ মারা যায়। পঙ্গুত্ব বরণ করে হাজার শতশত।

সর্বশেষ ২০১২ সালে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের তিস্তা নদীর বাম তীরে গ্রয়েইং বাধ নির্মাণ হয়েছিলো। তাও আবার ২০১৪ সালের বন্যায় বিলিন হয়ে যায়।
প্রতিবছরে বন্যা এলে সব চাইতে বেশি ক্ষতির হয় তিস্তার বামতীরে অবস্থিত হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের মানুষজনের। মোতাহার হোসেন এমপির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক শ্যামল ও তার বাবা ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ডাঃ আতিয়ার রহমান, বন্যা পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর নিজস্ব অর্থায়নে বাধ নির্মাণ করেন কিন্তু বন্যা এলে তা পানিতে স্রোতে ভাসিয়ে যায়। এর জন্য দরকার সরকারী খরচে শক্তিশালী বাধ নির্মাণ করা।

তিস্তা নদীর বামতীরে বাধ নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ মোতাহার হোসেন এম,পি বারবার পানি মন্ত্রীর কাছে গেলেও কোন লাভ হয় নি। উল্টো তিনি মোতাহার হোসেন এমপিকে তিরোষ্কার করে ঐ আসনে এরশাদ সাহেবের পরাজয়ের কথা শরণ করিয়ে দেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সুত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে লালমনিরহাট জেলাবাসী মনে করেন, তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখদুর্দশা লাঘব করতে এবং তিস্তার বামতীরে বাধ নির্মাণ করতে হলে যে কোন একজন আ’লীগের এমপিকে পানি সম্পৎ মন্ত্রীর দায়িত্ব দিতে হবে। অন্যথায় অন্য দলের কাউকে ঐ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিলে কোন দিনই আশার আলো দেখবেনা তিস্তা পাড়ের অসহায় বানভাসি মানুষেরা।

এবিষয়ে কথা হয় হাতীবান্ধা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার কলেজের অধ্যক্ষ ও মোতাহার হোসেন এমপির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক শ্যামলের সাথে। তিনি জানান, তিস্তা পাড়ের মানুষের জন্য মোতাহার হোসেন এমপির মন সর্বসময়ে কাদে। তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা করে তিনি সর্বমোট ১৬ বার ১৬ টি, ডিও, পএ নিয়ে পানি সম্পৎ মন্ত্রী আনিছুলের কাছে গিয়েও কোন লাভ হয় নি। ঐ মন্ত্রী আমাদের এমপির কথা কর্ণ পাত পর্যন্ত করেন নি।
তিনি আরও বলেন, ঐ মন্ত্রী মাঝে মাঝে তিরোষ্কার করে বলেন যে, আপনি মোতাহার হোসেন, আমাদের এরশাদ স্যারকে হাড়িয়ে এমপি হয়েছেন। এখন যান পরে দেখবো। এ ভাবে তিনি বারবার আমাদের মোতাহার হোসেন এমপিকে দুড়ে সরিয়ে রাখতেন ঐ পানি মন্ত্রী।
আমাদের মোতাহার হোসেন এমপির কথা যদি পানি সম্পৎ মন্ত্রণ আনিছুল হক একটি বারের জন্য হলেও শুনতেন, তাহলে আজকে আমাদের তিস্তা পাড়ের মানুষের এই দুঃখ দুর্দশা হত না।

এছাড়াও তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচলে গড্ডিমারী মানুষ ৯৭/’ভাগ ভোট দেন নৌকায়। এটা পানি মন্ত্রী সাহেব জানেন। এটা তার আরও বেশি ক্ষোভ।

তিস্তা পারে মানুষ মাননীয় প্রধান মন্ত্রী কাছে জোড় দাবি জানাচ্ছে যে জাতীয়পাটির পানি মন্ত্রী কে অব্যাহতি দিয়ে আ’লীগের যে কোনো এম,পিকে পানি মন্ত্রী হিসাবে দ্বায়িত্ব দিলে তিস্তাপারে মানুষের দুঃখ লগোব হবে।

উল্লেখ্য, গত ৫ দিনের ভারি বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে, লালমনিরহাট ৫ উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ লোক পানি বন্ধী রয়েছে। তিস্তা ব্যারেজে ফ্লাট বাইপাস সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়া পানির স্রোতে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সিঙ্গিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকা পাড়া ও ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সম্পুর্ন বিধস্থ হয় রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। তিস্তা ব্যারেজ ও আশপাশ এলাকায় রেড এলার্ট জারি করেছে পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়, স্কুলকলেজ, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, হাজার হাজার হেক্টর জমির আবাদি ফসল। পানির স্রোতে ভেসে যায় হাজার হাজার পুকুর ও  প্রজেক্টের মাছ। ক্ষতি হয় কয়েকশত কোটি টাকার।