বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, সোমবার, সকাল ১০.৩০ টায় জাতীয় প্রেসক্লাব ভিআইপি কক্ষে ‘‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা’’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপা’র সহসভাপতি অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব নসরুল হামিদ এমপি। অনুষ্ঠানে সুচনা বক্তব্য রাখেন পাওয়ার সেল এর প্রাক্তন মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ, নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ বিভাগ এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেল এর যুগ্মসচিব জনাব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি এর অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল এম ক্যামেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এর অধ্যাপক বদরুল ইমাম, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) এর এনার্জি প্যানেল এর চেয়ারম্যান ড. আহমেদ বদরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির পরিচালক এবং বাংলাদেশ সোলার এনার্জি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক সাইফুল হক, জিআইজেড এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা কর্মসূচীর প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী জনাব আল মুদাব্বির বিন আনাম, বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন ও ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক ও বাপা’র যুগ্মসম্পাদক জনাব শরীফ জামিল।

অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক বলেন, আমরা পরিবেশবান্ধব জ্বালানী চাই। দেশ ও জনগনের স্বার্থে সম্বিলিতভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণের আহবান জানান তিনি। আমরা আশা করি বিদ্যুৎখাত উন্নয়নে সরকার পরিবেশ ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সম্ভাবনাময় জ্বালানীখাতের উপর গুরুত্ব দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব নসরুল হামিদ এমপি বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তিগুলো গ্রহন করে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা না করে আমাদের দেশের বাস্তবতা চিন্তা করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণের জন্য যতটুকু খোলা জমি দরকার সেটিও আমাদের পর্যাপ্ত নেই। তবে এটি নিয়ে আমরা কাজ করছি, গবেষনা করছি। বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও একাজে যুক্ত হতে পারে। গবেষনার জন্য তাদেরকে সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত। সম্মিলিত উদ্যোগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও উন্নয়নে আমরা কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছি।

প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের নবায়ণযোগ্য জ্বালানির অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বে জীবাস্ম জ্বালানির দিকে ঝুকে পড়ছে সরকার। অথচ জীবাস্ম জ্বালানি পরিবেশ-মাটি, প্রকৃতি বান্ধব নয়। এথেকে সরে এসে সারাবিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমাদের এগুতে হবে।

ড. ড্যানিয়েল এম ক্যামেন বলেন, ভারত, দুবাই, ব্রাজিল, অস্টেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় বড় সোলার নির্ভর প্রকল্প চালু হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন চিন্তা করতে হলে সৌর জ্বালানির উপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। আর বাংলাদেশে এই সম্ভাবনা খুবই উজ্জল। তিনি বলেন, রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত ব্যয়বহুল কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য যুক্তিহীন।

অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, তেল, গ্যাস ,কয়লা থেকে তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কম। ভবিষ্যতে জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে সরকারকে চিন্তা করতে হবে।

অধ্যাপক মোঃ সাইফুল হক বলেন, জনবান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে জ্বালানি বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। এজন্য একটি নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহনের আহবান জানান।

ড. আহমেদ বদরুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো ও পরিবেশবান্ধব টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সরকারকে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে না লাগিয়ে সুন্দরবন বিনাশী ক্ষতিকর প্রকল্প নিয়ে কাজ করা দুঃখজনক।

জনাব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এবং এজন্য একটি লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়ও এটিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এটি নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও গবেষনা হচ্ছে। যেসকল প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে সেটি সমাধান করে কিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো যায় সে প্রচেষ্টা সরকার করে যাচ্ছে।

ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, জ্বালানি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা আজ ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে ভুল পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুচ্ছে। তবে আজ যারা কয়লা ভিত্তিক জ্বালানির পক্ষে কথা বলছে, তারাই এক সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে কথা বলবে। সে সময়টিও সম্ভবত: দুরে নয়। তাই এটি সরকারকে এখনই বুঝতে হবে। সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ইউনেস্কোসহ দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানীগন বারবার বলে আসলেও এবং এসকল গবেষনাপত্র সরকারকে প্রদান করা হলেও এই প্রকল্প নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃজনক। তিনি কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সড়ে এসে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহনের আহবান জানান।

জনাব শরীফ জামিল বলেন, দিন দিন প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে। বিশ্ব এসকল প্রযুক্তি গ্রহন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি পাশ্ববর্তী দেশ ভারতও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খরচ দ্রুত কমে যাচ্ছে। তাই কয়লা নির্ভর জ্বালানি থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির পরিকল্পনা গ্রহণ করার আহবান জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে হুমকীর মুখে ঠেলে দেয় সে উন্নয়ন আমরা চাই না। আধুনিক, বাস্তবসম্মত ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চাই।