 রাফাতুর রহমান রুবা
’কন্যাশিশুর জাগরণ আনবে দেশের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৩ অক্টোবর এবছরের জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। উদ্যোগটি নিশ্চিতই প্রশংসার্হ। বাংলাদেশের কন্যাশিশুর উন্নয়নে সরকার বেশ কতগুলো উদ্যোগ নিয়েছে । তার মধ্যে কন্যাশিশুদের উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে শিশু অধিকার সপ্তাহে একটি দিনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। শিশু অধিকার সপ্তাহ তো ছেলে মেয়ে সব শিশুর জন্য তবে কেন কন্যা শিশুর জন্য আলাদা দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে? বিশ্বের ১৭২ টি শিশুদের তুলনামূলক চিত্র দেখতে সম্প্রতি ’স্টোলেন চাইল্ডহুড’ বা চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব-২০১৭ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শিশু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্যা চিল্ড্রেন। প্রতিবেদনটি তৈরীতে ৭টি সূচক আমলে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো শিশুমৃত্যু হার, অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর হার, শিশুশ্রম, শিশুবিবাহ, অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান প্রসব ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। প্রতিবেদনটি বলছে বাংলাদেশ হাজারে ৬৮০ নম্বর পেয়ে ১৩৪ নম্বরে আছে। (প্রথম আলো; ০১ জুন ২০১৭) । এমডিজি সহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও এই প্রতিবেদন বলছে বাংলাদেশের শিশুরা ভাল নেই। কন্যাশিশুরা আরও বেশী ভালো নেই। উল্লেখিত সাতটি সূচকের অধিকাংশই ছেলে শিশুর চেয়ে কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে বেশী প্রযোজ্য। অল্প বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে, অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান ধারণে বাধ্য করে, শিক্ষাসহ শৈশবের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে কন্যাশিশুদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এক নির্মম অন্ধকারে! অপুষ্ট মা শিশু জাতিকে উপহার দিচ্ছে অপুষ্ট ভবিষ্যত। অনেক সময় কন্যাশিশুর মৃত্যুও হচ্ছে। এছাড়া কন্যাশিশুদের উপর সহিংসতাতো আছেই। সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং তাদের উপর নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় খাবারের লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ২০০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১৬ জনকে। (নয়াদিগন্ত ০১ আগষ্ট ২০১৭)। ধর্ষনতো সামান্য, শিশুদের উপর গণ ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে অহরহ! এদের অধিকাংশ শিশুর বয়স ৪ থেকে ৯ বছরের কম। নির্যাতনের আর একটি সংস্করণ হলো ভয় দেখিয়ে গণধর্ষণ করে তা ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া। (বাংলাদেশ প্রতিদিন; ০৮ অক্টোবর ২০১৭)। ধর্ষনের লীলা খেলা সহ শিশুদের উপর নির্যাতনের যে ব্যপকতা তার প্রধান শিকার আমাদের কন্যাশিশুরা। কন্যাশিশুদের সুরক্ষার জন্য ছোট বেলা থেকেই তাদের নিজেদের সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। এবিষয়ে পরিবারের সবার পরিস্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। আর যারা অপরাধ প্রবণ তাদের মনোসামাজিক জগতের পরিবর্তন এনে মানবিকতা জাগিয়ে তোলা এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সমাজ তথা রাষ্ট্রকে নিতে হবে কার্যকর ও সুদৃঢ পদক্ষেপ। সঠিক ও দ্রত আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তবেই এই কোমলমতি শিশুদের শৈশব হারিয়ে যাবেনা অমানিশায়! তাদের গ্রাস করবেনা এক অজানা অন্ধকার! শিশুদের সার্বিক অবস্থ্া বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার শিশুদের সুরক্ষায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন একটি সার্বক্ষণিক হটলাইন (নম্বর: ১০৯৮) এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি হেল্পলাইন (নম্বর: ১০৯) সেবা চালু করেছে। এই সেবাটির কার্যকারীতার জন্য কুইক রেসপন্স টীম গঠণ করে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিয়ে নজীর স্থাপন করার সময় এসেছে; আর দেরী নয়।