মোজাম্মেল হোসেন কামাল, নোয়াখালী প্রতিনিধি:
চরম ভোগান্তির শিকার গ্রাহকরা নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিনলক্ষাধিক টাকার ঘুষ বাণিজ চলছে। অফিস সুত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৯ জুলাই স্থাপিত হয় নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। ২০১০ সালে বর্তমান সরকারের অধিনে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে ঐ বছরের ১১ এপ্রিল এখানে এমআরপি কার্যক্রম শুরু হয়। এ পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ২ শতাধিকের বেশি আবেদন ফরম জমা পড়ে। নিয়ম-নীতি মানতে গিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করেও মিলছে না পাসপোর্ট। ফলে বাধ্য হয়ে দালাল চক্রের হাতে জিম্মি হতে হচ্ছে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের। নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা দালাল চক্রের মাধ্যমে পাসপোর্ট না করালে সময়মত পাসপোর্ট পাওয়াটা অসাধ্য হয়ে পড়ে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ২ শতাধিক পাসপোর্টের আবেদনে প্রতিটি পাসপোর্টে ২ হাজার ৫০ টাকা করে ৪ লক্ষাধিক টাকার ঘুষ বাণিজ্য চলে। এরমধ্যে ব্যাংক ড্রাফট করতে ব্যাংকে অতিরিক্ত দিতে, ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে নেয় কমপক্ষে ৫’শ থেকে ১হাজার টাকা।

জানা যায়, নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বিশেষ এ দালাল চক্রের সদস্যরা সার্বক্ষণিক পাসপোর্ট অফিসের প্রধান গেটের সামনে ও আস পাশে ঘুরা ফেরা করে। এ ছাড়া জেলা শহর মাইজদী ও পাসপোর্ট অফিস এলাকায় দালাল চক্রের সদস্যরা ব্যাঙ্গের ছাতার মত অফিস বসিয়ে সেখান থেকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কার্যক্রম। যখনই কোন ব্যাক্তি পাসপোর্ট করতে আসেন তখনই তাকে পড়তে হয় এ চক্রের সদস্যদের কবলে। দালাল চক্রের কথা মত পাসপোর্ট না করলে পাসপোর্ট প্রত্যাশী ব্যাক্তিকে পড়তে হয় বিপাকে। নিজের পাসপোর্ট নিজেই করতে গেলে পাসপোর্ট সময় মত হাতে পাওয়াটা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কারণ দালাল ছাড়া পাসপোর্টের ফরম পূরণ করে কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে গেলে সেই ফরম নানা অজুহাতে ফেরত দেওয়া হয়। বর্তমানে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস পুরোটাই যেন দালাল চক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

পাসপোর্ট প্রত্যাশ কামাল হোসেন জানান, ফরম পূরন করে সরকারি ফি বাবদ ব্যাংক ড্রাফটসহ পাসপোর্ট অফিসে জমা দেয়ার পর অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক আবদুল মোতালেব ফরমে একাধিক ভুল হয়েছে অযুহাত দেখিয়ে ফেরত দেয়। পুনরায় ফরম পুরন করে ওই অফিসে গেলে একই অযুহাতে ফেরত পাঠানো হয়। পরে অতিরিক্ত ২ হাজার ৩’শ টাকা দিয়ে দালালদের মাধ্যমে ফরম পুরন করে জমা দিলে পিঙ্গার পিন্ট নেয় অফিস কর্তৃপক্ষ।

একাধিক পাসপোর্ট প্রত্যাশী অভিযোগ করে জানান, দালালের মাধ্যমে বাড়তি ২/৩ হাজার টাকা ঘুষ দিলে হত্যা মামলার আসামিরও যাচাই বাছাই ছাড়া পাসপোর্ট পেতে সমস্যা হয় না। কিন্তু সরাসরি পাসপোর্ট ফরম জমা দিতে গেলে এটা ভুল, ওটা ভুল বলে হয়রানি শুরু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানান, পাসপোর্ট অফিসে আমাদের বদনামটাই বেশি। অথচ প্রতি পাসপোর্টে আমারা পাই মাত্র ২-৩’শ টাকা। অতিরিক্ত সব টাকা যায় রাঘববোয়ালদের পেটে। জানতে চাইলে সে আরো জানান, প্রতিটি পাসপোর্টে ২ হাজার ৫০ টাকা অতিরিক্ত নেয়া হয়। এরমধ্যে ব্যাংক ড্রাফট করতে ব্যাংকে অতিরিক্ত দিতে হয় ২০ টাকা, পাসপোর্ট অফিস নেয় ১ হাজার ৫০ টাকা ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করতে নেয় ৬’শ টাকা।

দালাদের ভাষ্য ও গ্রাহকদের অভিযোগের হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২ শতাধিক পাসপোর্ট ফরম জমা পড়লে প্রতিটি ফরমে ২ হাজার ৫০ টাকা করে প্রতিদিন ৪ লক্ষাধিক টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয় এই পাসপোর্ট অফিসে।

নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বর্তমান সহকারী পরিচালক আল আমিন মৃধা ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারী যোগদানের পর স্থানীয় বিভিন্নœ শ্রেণীর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাংবাদিকদের নিয়ে পাসপোর্ট সপ্তাহ পালন উপলক্ষে আয়োজিত উন্মুক্ত আলোচনায় আগামীতে আর পাসপোর্ট নিয়ে কোন গ্রাহক হয়রানী ও অনিয়ম হবে না জানালেও বর্তমানে তার অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে ঘুষ ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়াটা অনেকটা অসাধ্য।

সহকারী পরিচালক আল আমিন মৃধা অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে বলেন, যে কোন অনিয়মের ব্যাপারে আমি সাথে সাথে অ্যাকশন নেই। মানুষের সেবা করতে সরকার আমাদের এখানে বসিয়েছে। পাসপোর্ট সেবা নিতে গ্রাহকরা হয়রানির স্বীকার হবেন কেন? সরকারের নির্ধারিত ফি জমা দিয়েই পাসপোর্ট করতে পারেন গ্রাহকরা। তিনি বলেন আমি এখানে আসার পর দালালদের অফিসে ঢুকাই বন্ধ করে দিয়েছি।