নেপালে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত সকলের স্বরণে নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে আজ ০২ এপ্রিল ২০১৮, সোমবার, বিকেল ৪.০০টায়, শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, শাহবাগ, ঢাকায় এক নাগরিক শোকসভার অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ ২০১৮, নেপালের ঐ দুর্ঘটনায় নিহত হন ‘সুজন’-এর কেন্দ্রীয় সহযোগী সমন্বয়কারী সানজিদা হক বিপাশা, তার স্বামী রফিক জামান রিমু ও একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধ জামান-সহ মোট ৫২ জন।

শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। অতিথি হিসেবে নিহতদের স্মৃতিচারণ ও বক্তব্য পেশ করেন ড. এটিএম শামসুল হুদা, ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. হামিদা হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এনাম আহমেদ চৌধুরী, এস এম আকরাম হোসেন, ড. তোফায়েল আহমেদ, ড. বদিউল আলম মজুমদার, রানা দাশগুপ্ত, প্রকৌশলী মুসবাহ আলীম এবং ড. আসিফ নজরুল প্রমুখ।

সভার শুরুতে নিহতদের প্রতিকৃতিতে পু®পস্তবক অপর্ণ, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এরপর সানজিদা হক বিপাশ ও রফিক জামান রিমুর ওপর নির্মিত ¯¬াইড শো প্রদর্শিত হয়।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে নিহতদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন নিহতদের স্বজন ও আমন্ত্রিত অতিথিগণ।

এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, সুজন-এর সভাপতি হিসেবে সানজিদা হক বিপাবার সাথে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। সে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলো। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাওয়া যেন সহনীয় হয়ে গেছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনাগুলোর কঠোরভাবে তদন্ত হওয়া দরকার এবং দোষী বক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, সানজিদা হক বিপাশার অকাল মৃত্যুতে আমরা এক নিবেদিত প্রাণ সমাজকর্মীকে হারালাম। বিপাশা এবং রিমু কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করতেন এবং সে কমিটমেন্ট ছিল সমাজের উন্নয়নে কাজ করার কমিটমেন্ট। আমরা আশা করবো, যে কাজগুলো বিপাশা করছিল, সে কাজগুলো আরও ভালোভাবে করার মাধ্যমেই আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে পারি। তিনি বলেন, বিমান দুর্ঘটনা শুধুই দুর্ঘটনা নয়, বরং এগুলো হয় অব্যবস্থাপনার কারণে। তাই ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না হয় এজন্য বিমান কো¤পানিগুলোক সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তার বিধান করতে হবে। নাগরিকদের জান-মাল রক্ষার জন্যই রাষ্ট্রকে এত ক্ষমতা দেয়া হয়।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সানজিদা হক বিপাশা ছিল আমার কন্যাতুল্য। বিগত ১৩ বছর আমরা একসাথে কাজ করেছি। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স¡প্ন দেখতেন, বিপাশাও সে একই ধরনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতো। আমরা প্রয়াত সানজিদা হক বিপাশার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারি, যদি বিপাশার অসমাপ্ত কাজগুলোকে করতে পারি এবং দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যতদূর দেখেছি, সানজিদা হক বিপাশা অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য মানুষ ছিল। সে নিরবেই অনেক কাজ করতো। আমি তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তিনি বলেন, আমরা দেখছি বর্তমানে বেসরকারি বিমানে নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং কর্মীদের দিয়ে বেশি কাজ করানো হয়। ভবিষ্যতে যাতে যদি কাউকে এ ধরনের দুর্ঘটনা না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় ৫২ জনের মারা যাওয়া আমরা যেমন মেনে নিতে পারি না, একইভাবে যারা দেশের অভ্যন্তরে ত্বকী ও তনুর মত হত্যার শিকার হয়, কিন্তু তাদের খুনীদের বিচার হয় না–তাও মেনে নিতে পারি না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সানজিদা হক বিপাশা ছিল আমার মেয়ের মতন। বিগত ১০-১২ বছর ধরে আমরা একসাথে কাজ করেছি। সে কাজে ছিল দক্ষ, সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিত। তার অনেক গুণ ছিল। প্রতিবন্ধী গণতন্ত্রকে সঠিক পথে নিয়ে আসা ও সুস্থ করার জন্য কাজ করতো সে। তাকে নিয়ে আজ আমাদের অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে–এটা মেনে নিতে পারছি না। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য গণপরিবহন ও বিমান কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাই।

ড. হামিদা হোসেন বলেন, সানজিদা হক বিপাশা এবং রফিক জামান রিমু প্রথাগত চাকরি করতেন না, বরং তারা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করতেন। তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সমাজের পরিবর্তন চাইতেন, তারা ছিলেন মানবতাবাদী এক দ¤পতি। তিনি বলেন, নেপালের বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে। এ ধরনের ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, এগুলো অপরাধ।

ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম বলেন, সানজিদা হক বিপাশা সুজন-এর অনুষ্ঠানে এবং রফিক জামান রিমু প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতো। রফিক জামান প্রতিবন্ধীদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি খুবই দক্ষ ছিলেন। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা যৌথভাবে কাজ করেছি। তাই এই ধরনের কর্মমুখী ও প্রতিভাবান মানুষের অকালে চলে যাওয়া আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিমান দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা দরকার।