সাংবিধানিক হিসাবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই অজানা নানা শঙ্কা ডালপালা মেলছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি কি আবারও নির্বাচন বয়কটের পথে হাঁটছে, নাকি মুখে নানা কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে শরিক হবে- কোনো ফর্মুলায় এর সহজ সমাধান এখনো কেউ মেলাতে পারছেন না। আবার বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে ক্ষমতাসীনরা, নাকি বিদ্যমান সংবিধানে বাতলে দেওয়া পথেই থাকবে- এটিরও চূড়ান্ত উত্তর জানা নেই কারোই। এসব প্রশ্নের জবাব এখনো অজানা থাকায় নির্বাচনের ভাগ্যই দুলতে শুরু করেছে আশা-নিরাশার দোলাচলে। এই দোলাচলের মধ্যেই বাড়ছে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা। কারণ নির্বাচন নিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে এখন পর্যন্ত অনড় রয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। সবমিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে গভীর সংকটের আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই শঙ্কা বা অনিশ্চয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ধ্বনিত হচ্ছে বিদেশেও। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি তাদের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে আগামী নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে। আর প্রতিবেশি দেশ ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ঢাকা সফরে এসে বলেছেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই ভারতও চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।’ একইসঙ্গে তিনিও আগামীতে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর জোর দিয়ে গেছেন।

নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট এক ধরনের এই অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের আশঙ্কা সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল রবিবার সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘রাজনৈতিক ভবিষ্যত্বাণী করা কঠিন। কী হবে, কী হবে না-আগে থেকে চূড়ান্ত করে বলা সম্ভব হয় না। কারণ এখন যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজমান, শেষবেলায় সেরকম না-ও থাকতে পারে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিবন্ধন টিকিয়ে রাখতে হলেও বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। সেজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা রাখছি, সকল পক্ষ সার্বিক দিক ও ভবিষ্যত্ পরিণতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ ধরবে। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে এখানে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার আহ্বান কোনো কাজে আসছে না। সেজন্য বিদেশিদের কেউ কেউ সংঘাতের আশঙ্কা করছেন, সেটিও একেবারে অমূলক নয়।’

সংঘাতের এই আশঙ্কার মধ্যেই শনিবার চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ফেনীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে দুষছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে আগামী নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যেও সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনের সময় যত কাছে আসবে, এসব সংঘাত আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর বাইরে রাজনীতির অন্দর মহলেও আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা সমীকরণ-আলোচনা-বিশ্লেষণ শোনা যাচ্ছে। এসব আলোচনায় ঘুরেফিরে যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসছে তা হল- নির্বাচন হবে কিনা। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, যথাসময়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, এর বাইরে অন্য কোনো বিকল্প নেই।

এসব গুঞ্জন-আলোচনা সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এখনো মনে করি পুরোপুরি দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় বর্তমান সংসদ বহাল থাকবে- এটা একটা সমস্যা। নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞা ও প্রশাসনকে রাজনীতিকরণের বিষয়টিও একটা সংকট। এসব বাস্তবতায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরেও সহিংসতা কম হয়নি। আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে আমরা বলে এসেছি- নির্বাচন মানে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচন মানে কারচুপি বা একতরফা নির্বাচন নয়। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে কিছু বাধা আছে-সেগুলো তাদেরকে স্পষ্ট করে বলা উচিত। তাহলে হয়তো সমাধানের একটা উপায় বের হতে পারে।’

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীনরা চাইলেও দশম সংসদের আদলে একাদশ নির্বাচন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। আবার উন্নয়ন-রূপরেখা সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইলে সরকার কী সবার অংশগ্রহণে ‘সুষ্ঠু-স্বাভাবিক’ ভোটের লড়াইয়ে যেতে পারবে? এমন বাস্তবতায় সামনের দিনগুলোর গতিপথ কেমন হবে সেটি ধারণা করা মুশকিল।

এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার দাবি আংশিক বা সম্পূর্ণ পূরণ না হলে বিএনপি দশমের মতো একাদশ সংসদ নির্বাচনও বর্জন করবে, নাকি কোনো অবস্থাতেই একাদশে আর ওয়াকওভার দেবে না-এর কোনোটিই এখনো সুনির্দিষ্ট করেনি দলটি। বরং নির্বাচনকে সামনে রেখে সব ধরনের বক্তব্যই রেখে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্ব। এসব বক্তব্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে আগামীতেও নির্বাচনে না যাওয়া, বিএনপিকে বাইরে রেখে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন হতে না দেওয়া-উভয় ধরনের বার্তাই রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নির্বাচন হবে, সেখানে সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা দিয়ে যাবে।

মূল দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এমন বৈরী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন, নিরপেক্ষ, নির্দলীয় বা সহায়ক-যে ধরনের সরকারের কথাই বলুক না কেন, আমার মতে-বিএনপির এই দাবির এখন আর তেমন কোনো ভিত্তি নেই। আগামী নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত এই সরকারের অধীনেই হবে। আমরা দেখছি, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি নেতাদের সারাদেশে জনসংযোগে আগ্রহ কম। বরং সংবাদ সম্মেলন আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দৌড়াদৌড়ি করেই তারা সময় অপচয় করছে।’

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন প্রশ্নে দলটি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প বিবেচনায় রাখা হয়েছে। নির্বাচন ও আন্দোলন, দুটোরই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে দলটি। দলের একাংশের মতে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে যদি কোনো সমঝোতা না হয় তাহলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। এই অংশটির যুক্তি হলো, যদি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে এতে একদিকে প্রমাণ হবে যে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ভুল ছিল-সেটি বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছে। এছাড়া এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ও সংসদকেও বিএনপি ‘রাজনৈতিক বৈধতা’ দিয়েছে বলে ধরে নেবে দেশের মানুষ।

এই মতে বিশ্বাসী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘প্রয়োজনে কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তবুও শেখ হাসিনার অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব না।’ সম্প্রতি গয়েশ্বর আরো বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য দলের কেউ কেউ ষড়যন্ত্র করছেন, তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে দলের নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন তিনি।