‘একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক হলফনামার বিধান বাতিল চাওয়ার প্রস্তাব হতাশাজনক ও অনভিপ্রেত। কারণ এ দাবি ভোটারের বাক্ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অন্তরায় এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠার জন্য অশনিসংকেত’ বলে মন্তব্য করেছেন ‘সুজনÑসুশাসনের জন্য নাগরিক’ নেতৃবৃন্দ। তাঁরা আজ ২২ অক্টোবর ২০১৭, সকাল ১১.০০টায়, সুজন আয়োজিত ‘প্রার্থী কর্তৃক প্রদত্ত হলফনামা বিধান বাতিলের প্রস্তাবের প্রতিবাদে’ এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সহ-সভাপতি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও কেন্দ্রীয় সহযোগী সমন্বয়কারী সানজিদা হক বিপাশা উপস্থিত ছিলেন।

 

লিখিত বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘কমিশন তাদের রোডম্যাপ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে সংলাপও প্রায় শেষ করেছে। সংলাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও এসেছে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, গত ৮ই অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে একটি রাজনৈতিক দল ‘হলফনামা’র মত গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাতিলের প্রস্তাব করেছে। আমরা মনে করি, এ দাবি হতাশাজনক ও অনভিপ্রেত। নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত, অর্থাৎ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে এ বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি বাতিল করার ক্ষমতা কারোরই নেই, এমনকি নির্বাচন কমিশনেরও। কারণ এই প্রস্তাব ভোটারের বাক্ স্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।’

তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২৪ মে ২০০৫ তারিখে ‘আব্দুল মোমেন চৌধুরী ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ’ (২০০৫ সালের রিট পিটিশন নং ৫৭) মামলায় এক যুগান্তকারী রায় দেন। রায়ে আদালত নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী থেকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আট ধরনের তথ্য হলফনামা আকারে সংগ্রহ এবং এগুলো গণমাধ্যমের সহায়তায় জনগণের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ প্রদান করেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার আমাদের দেশে খুব সহজেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি। এর পেছনে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত উচ্চ আদালতে নগ্ন জালিয়াতি, আমাদের কিছু আইনজীবী ও বিচারপতির বিতর্কিত আচরণ এবং ‘সুজন’-এর মতো নাগরিক সংগঠনের সক্রিয়, সাহসী ও নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকা। আদালতের রায়ের মাধ্যমে নির্বাচনে হলফনামা দাখিল করার যে বিধানটি আমরা পেলাম একটি রাজনৈতিক দল অতীতের ন্যয় আবার হলফনামা প্রদানের বিধানকে ভণ্ডুল করার চক্রান্তে লিপ্ত বলে মনে হচ্ছে। জনগণের তথ্য অধিকার রহিতের এ অপচেষ্টা বর্তমানে নয়,অতীতেও বহুবার করা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘যে হলফনামা বর্তমানে ব্যবহার করা হয় তা অসম্পূর্ণ এবং ভোটারদেরকে সত্যিকারর্থেই তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করতে হলে এতে আরও কিছু বিষয় যোগ করা আবশ্যক। তাই হলফনামার বিধানটি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে যদি নির্বাচন কমিশন হলফনামার ছকে পরিবর্তন এবং এগুলোর সঠিকতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। আমরা মনে করি যে, হলফনামা যাচাই-বাচাই করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাসেম মামলায় [৪৫ ডিএলআর (এডি) (১৯৯৩)] সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন আইনি বিধানের সাথে সংযোজনও করতে পারেন’। অর্থাৎ সর্বোচ্চ আদালত কর্তক স্বীকৃত ‘অন্তর্নিহিত ক্ষমতা’ (রহযবৎবহঃ ঢ়ড়বিৎ) ব্যবহার করে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে হলফনামা যাচাই-বাছাই করতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন জনস্বার্থের প্রতি কমিশনের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা।’

পরিশেষে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন ও কলুষমুক্ত করতে হলে হলফনামার বিধান আরও কীভাবে কার্যকর করা যায় সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগী হতে হবে।’

এই প্রেক্ষাপটে তিনি সংবাদ সম্মেলনে সুজন-এর পক্ষ থেকে কতগুলো দাবি তুলে ধরেন যথা: প্রথমত, কমিশনকে হলফনামার বর্তমান ছকটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। কেননা হলফনামার ছকটি অসম্পূর্ণ এবং এতে গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে হলফনামায় নতুন করে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করছি: ১. প্রার্থীর বয়স; ২. বিদেশি নাগরিকত্ব আছে কিনা; ৩. আয়ের উৎসের বিস্তারিত বিবরণ; ৪. কারা প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীল তার বিস্তারিত বিবরণ; ৫. সরকারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে কিনা ইত্যাদি। বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা প্রয়োগ করে হলফনামায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন কমিশন আনতে পারে। আমরা ইতিমধ্যেই সুজন-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়গুলো সংযোজন করে একটি ছক তৈরি করেছি এবং প্রস্তাবিত খসড়া ছকটি সুজন-এর ওয়েভসাইটে রয়েছে (িি.িংযঁলধহ.ড়ৎম; িি.িাড়ঃবনফ.ড়ৎম) । দ্বিতীয়ত, বিরুদ্ধ হলফনামা প্রদানের বিধান সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক হলফনামার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী (যেমন, মৎসজীবী রাজনীতিবিদ) ও তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসঙ্গত, হলফ করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া ফৌজদারি অপরাধও বটে। একইসঙ্গে কমিশনের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কমিশন হলফনামা যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নিতে পারে। চতুর্থত, হলফনামাসহ মনোনয়নপত্র ‘ইলেকট্রনিক ফাইলিং’-এর বিধান করা জরুরি, যাতে তথ্যগুলো দ্রুততার সঙ্গে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। পঞ্চমত, হলফনামা অনলাইনে জমাদানের ব্যবস্থা রাখা। ষষ্ঠত, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হলফনামার বিধান যুক্ত করা।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, ‘আবু ছাফা নাটক এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রার্থী কর্তৃক হলফনামার বিধানটি কার্যকর হয়েছে। আজ এটিকে বাতিল করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে। অথচ আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য এবং প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের বিস্তারিত অবগত হওয়ার জন্য হলফনামার বিধানটি অপরিহার্য।’