বিশ্ব নদী দিবস পালন উপলক্ষ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), রিভারাইন পিপল ও ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ এর উদ্যোগে আজ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার, সকাল ১০.৩০ টায় জাতীয় প্রেসক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে ‘‘বাংলাদেশের নদীর সংকট ও করণীয়’’ শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় নৌপরিবহন মন্ত্রী জনাব শাজাহান খান, এমপি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান জনাব মোঃ আতাহারুল ইসলাম ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য শারমীন মুরশিদ উপস্থিত ছিলেন। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রাক্তন সার্বক্ষনিক সদস্য জনাব মোঃ আলাউদ্দিন, ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক ও বাপা’র যুগ্মসম্পাদক জনাব শরীফ জামিল এবং রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব জনাব শেখ রোকন। আলোচনায় অংশগ্রহন করেন রিভার্স সেভিং নেটওয়ার্ক-যুক্তরাজ্যের সভাপতি রফিকুল হাসান জিন্নাহ ও বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়কারী মিহির বিশ্বাস।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী জনাব শাজাহান খান এমপি বলেন, বাংলাদেশ নদীবেষ্টিত দেশ, নদীকে ঘিরেই আমাদের জীবন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অথচ নদীমাতৃক বাংলাদেশের বহুনদী আজ হারিয়ে গেছে। জাতির জনক নদী রক্ষার বিষয়টি মনে প্রাণে ধারণ করতেন। তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে নদী সংরক্ষণ ও নাব্যতা নিশ্চিত করতে অনেক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। কিন্তু তারপর দীর্ঘ সময়ে অন্য সরকারগুলোর নদী রক্ষার জন্য কার্যকর কোন পদক্ষেপ না থাকায়, নদীগুলো দখল-দূষণের কবলে পরে হারিয়ে গেছে। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় প্রত্যয় ও আন্তরিকতায় নদী সংরক্ষণে আমরা অনেক পদক্ষেপ গ্রহন করেছি। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নদী খননসহ নদীকে দখল-দূষণমুক্ত করতে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে ১১৮টি নৌপথ চিহ্নিত করে তা সচলের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বড়াল নদীর প্রবাহ বাধা সৃষ্টিকারী ৪টি পাকারাস্তা কেটে এই নদীকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ শুরু করেছি এবং এধরণের কার্যক্রম আমাদের অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে নদীর সীমানা পিলার বসানো নিয়ে যে ত্রুটি রয়েছে, তাও সংশোধন করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নদী রক্ষা করা সরকারের একার কাজ নয়, এটি সকলের সম্মিলিত কাজ। নদীকে যত বেশী ভালবাসবে, সে দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত উন্নত হবে।

জনাব মোঃ আতাহারুল ইসলাম বলেন, নদী রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনে ‘নদী আদালত’ তৈরীর আহবান জানান। নদীর সঠিক তথ্য (ডাটাবেজ) সংগ্রহ, বৃত্তাকার নৌপথ চালু, খাল-জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার, এতদাঞ্চলের অভিন্ন নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে ন্যায্যা হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টা চালানো, জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ১৯৯৭ এ অনুসমর্থন করার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানান।

শারমীন মুরশিদ বলেন, নদী রক্ষায় নদী টাস্কফোর্সসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের যে সকল সিদ্ধান্ত রয়েছে তা বাস্তবায়নের আহবান জানান। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করা; নদী দখলকারীদের শাস্তির আওতায় আনা; অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে আঞ্চলিক পানি ফোরাম তৈরী করার আহবান জানান। তিনি আরো বলেন, নদী রক্ষায় আমাদের সকলকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের ভাবনায় নদী রক্ষার বিষয়টিকে জায়গা করে নিতে হবে।

জনাব মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলো আজ মহাবিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। অবৈধ দখল, নদীর শ্রেনী পরিবর্তন ও দূষণের মাধ্যমে অব্যাহতভাবে নদী ধবংস হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদীগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষার জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনার প্রস্তাব গ্রহন করেছে। ইতিমধ্যে জলাভূমি ইজারা বন্ধে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নদী দখলে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ জনগনও জড়িয়ে পড়ে ও নদী দূষণ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানার দূষণ, নদীর মধ্যে চাষাবাদ, ইটভাটা তৈরী, বালু উত্তোলনসহ নানাভাবে নদীকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সরকারী উদ্যোগে নদী রক্ষায় জেলা পর্যায়ে যে সব কমিটি করা হয়েছে এসব কমিটিকে সক্রিয় করে নদী রক্ষায় নির্দেশনা প্রদান ও পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান তিনি।

শরীফ জামিল বলেন, অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধান ও নায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহনের আহবান জানান এবং এজন্য যৌথ নদী কমিশনকে কার্যকর করতে পদক্ষেপ গ্রহনসহ এতদাঞ্চলের ৫টি দেশকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোতে আনার প্রচেষ্টা চালানোর আহবান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নদীর সংকটগুলোর জন্য দায়ী হলো নীতিহীনতা, পলিসির সমস্যা, নদীকে ঘিরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব এবং নদীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা।

শেখ রোকন বলেন, অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা, সুফল ভাগাভাগি ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে নদীগুলো চিহ্নিত করে সকল নদীর জন্য আলাদা কোন চুক্তি না করে ‘ভারত-বাংলাদেশ নদী চুক্তি’ নামে একটি চুক্তি গ্রহনে পদক্ষেপ গ্রহনের আহবান জানান। পাশাপাশি জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদ ১৯৯৭ এ অনুসমর্থন করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন, নদী রক্ষায় একটি কার্যকর নদী নীতি তৈরী ও তা বাস্তবায়নের আহবান জানান।