রিপোর্টার নানা: বৃহস্পতিবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সংবাদ সম্মেরনে বলেছেন, মন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকের পরও কমেনি চালের দাম। চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা চালের দাম ২ থেকে ৩ টাকা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে গত দুদিন আগে বানিজ্যমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই নয়। কারন এর প্রভাব বাজারে এখনো পড়েনি। গতকালও মোটা চাল ৫৫ টাকা ও মাঝারি সরু চাল ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চাল কিনতে আসা ক্রেতারা বলেন, চালের দাম কমার কথা বলা হলেও তারা আগের দামেই চাল কিনছেন। গণমাধ্যমের খবর-রাজধানীর পাইকারি চালের বাজার বাবু বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে পূর্বের দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম নিয়ে মন্ত্রীদের বক্তব্য ডাহা চাপাবাজিতে পরিণত হয়েছে। যার সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই। গত দু’দিন আগে মন্ত্রীদের সাথে চাল ব্যবসায়ীদের বৈঠকের সময় ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলেন-কোথায় এক কোটি টন চাল আছে দেখান। সেসময় মন্ত্রীরা এর কোন সদুত্তর দিতে পারা দুরে থাক অসহায়ের মতো নিরুত্তর ছিলেন। এই ভোটারবিহীন সরকারের দম্ভ আর ধমক ছাড়া জনগণকে দেয়ার আর কিছুই নেই।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে খোলাবাজারে কিনতে আসা নি¤œবিত্তদেরকে ওএমএসের মোটা সেদ্ধ চালের পরিবর্তে আতপ চাল দেয়া হচ্ছে। আতপ চালের বিক্রি বাড়াতে ডিলাররা আটা ক্রেতাদের জোরপূর্বক আতপ চাল নিতে বাধ্য করছেন। ক্রেতারা আটা চাইলে সঙ্গে আতপ চালও দিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তা নিতেও বাধ্য করা হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। আতপ চাল না কিনলে আটা মিলছে না। যা অত্যন্ত অমানবিক ও গরীব মানুষদের সঙ্গে জোর জবরদস্তির শামিল। অন্যদিকে খোলা বাজারে বিক্রির (ওএমএস) চালের দাম বাড়ানো হয়েছে কেজিতে ১৫ টাকা। সেখানে চালের দাম ১৫ টাকা কেজি থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৩০ টাকা করা হয়েছে, তাও আবার সেটি আতপ চাল, যা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভাত হিসেবে খেতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অমানবিক। দূর্ভিক্ষের ছায়া এখন সারাদেশের ওপর বিস্তারলাভ করেছে। ধন-ধান্যে ভরা বাংলাদেশ এখন ভরে উঠতে যাচ্ছে ‘ভাতের ফ্যান দাও’ চিৎকারে। বাংলাদেশে মহামন্বন্তর ধেয়ে আসছে। লুটপাট আর দখলবাজীর নীতি নিয়ে চলতে শুরু করায় এই সরকারের দু:শাসনে দেশের সর্বত্র দারিদ্র, দুর্দশা ও অসাম্যের করুণ কাহিনী ছাড়া আর কোন উন্নয়ন বাংলাদেশের জনগণ চোখে দেখেনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ দশ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলেছে। এই দশ টাকা কেজি’র চাল শুধুমাত্র কেতাবেই আছে, গোয়ালে নেই। গত পরশু দিন খাদ্যমন্ত্রী বললেন, দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। এই দশ টাকা কেজির চাল কে পেয়েছে ? জনগণ তো পায়নি। সারাদেশে নিরন্ন দরিদ্র মানুষ দশ টাকার কেজি চালের কথা শুধুমাত্র স্বপ্নেই দেখেছে। তাহলে এই এতদিন দশ টাকার কেজি চাল কারা পেয়েছে সেটা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। ক্ষমতাসীন দলীয় লোকেরা দশ টাকা কেজির চাল বিক্রির নামে সরকারী গোডাউন থেকে চাল নিয়ে চড়া মূল্যে কালোবাজারে বিক্রি করেছে। মন্ত্রীর দুদিন আগে দেয়া দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি বন্ধের ঘোষনা বোঝা গেল প্রকল্পটি ছিল ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের লুটপাট প্রকল্প।
আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ওএমএসসহ সকল প্রকার চালের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন ও নির্যাতন-নিপীড়ণের মাধ্যমে তাদেরকে স্বদেশ ছাড়তে বাধ্য করার প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঝড় বইছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ চুক্তি বাতিল করেছে যুক্তরাজ্য। এছাড়া সুচিকে দেয়া পদকও ফিরিয়ে নিয়েছে বিশ্বের কয়েকটি নামী-দামী সংগঠন। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নির্যাতনে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। মিয়ানমারের সেনা নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিকসহ নানা বিষয়ে গভীর সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রীর মাত্র এক লাখ টন চালের জন্য স্বস্ত্রীক মিয়ানমার সফর রোহিঙ্গা ইস্যু সমস্যা সমাধানের পথকে দুর্বলই করেনি এতে দেশের আত্মমর্যাদাও ভুলুন্ঠিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের রক্তের বিনিময়ে চাল কেনা হচ্ছে বলে জনগণ বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ সরকারের অনুনয়-বিনয় নীতি যে আত্মবিক্রিত নতজানু পররাষ্ট্র নীতিরই প্রতিফলন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই-এটি রোহিঙ্গা সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে।
রিজভী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মানবিক কারনে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হলেও তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তায় মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন ছিল। বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে বাংলাদেশের ভূমি, জলসীমা, স্থলসীমা ও আকাশসীমা উজাড় করে দিয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব লংঘনের শামিল। যা দেশের স্বাধীনতার পর কোন সরকারই করেনি। আজকের এই সংকটমূহুর্তে আমরা নিকট প্রতিবেশী দেশের ভূমিকায় বিস্মিত হচ্ছি। তারা সরাসরি মিয়ানমার সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। সরকার যদি বাংলাদেশকে উজাড় করে না দিতো, যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বার্গেনিংয়ের কোন পথ রাখতো তাহলে নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে আমরা সক্ষম হতাম। শুধুমাত্র ভোটারবিহীন সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে সবকিছু উজাড় করে দেয়ার নীতি অবলম্বনের কারনেই বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের প্রধান ও সরকারের মনস্তত্ত্বে যেটি নেই-তাহলো সততা, মর্যাদা, সহানুভুতি, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার সক্ষমতা।
রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো এমন ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। বিএনপি’র পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যের কথা বারবার বলা হলেও সরকার জমিদারের ন্যায় নিজেদেরকে দেশের একক মালিক ভেবে একতরফা ও একগুঁয়েমিভাবে কাজ করছে, ফলে রোহিঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় প্রকট হয়ে উঠেছে। সুযোগ সন্ধানী রাজনীতির খেলায় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদেরকে দাবার ঘুঁটি বানিয়ে নিজের মহিমা অর্জনের চেষ্টায় ম্যাকিয়াভেলীর নীতি প্রয়োগে অক্লান্ত রয়েছেন। আবারো আপনাদের সামনে আমাদের দলের পক্ষ থেকে আসন্ন দুর্গাপুজা নিয়ে সরকারের নানামুখী নীলনকশা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। দুর্গাপুজার প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীদের দ্বারা হিন্দু মন্দির আক্রমণ এক অশুভ চক্রান্তেরই বহি:প্রকাশ। কিন্তু নির্লজ্জ সন্ত্রাসী তান্ডবের এক বিভিষিকা তৈরী করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ওপর চাপানো আওয়ামী পুরনো নীতি সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি হিন্দু মন্দিরে ক্ষমতাসীন দলের লোকরা আক্রমণ চালিয়ে ভাংচুর করে পুলিশ প্রশাসনকে দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। দিনাজপুরে বিএনপি’র যুগ্ম আহবায়ক বখতিয়ার আহমেদ কচিসহ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বিনা মামলায় গ্রেফতার করে চব্বিশ ঘন্টা পর মন্দির ভাংচুরের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে মামলা দেয়া হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়-হিন্দুদের মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনায় ক্ষমতাসীনরাই জড়িত। আওয়ামী লীগ মন্দির ভাঙ্গার সন্ত্রাসী তান্ডবের কাজগুলো করছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট বিএনপি’র ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য। সুতরাং বিএনপি নেতাদের নামে কাল্পনিক মামলা দিয়ে সত্যকে আড়াল করা যাবে না। আওয়ামী সরকারের মধ্যে একটা অশুভ আত্মা আছে। চরম মিথ্যাচার ও নির্মমভাবে বিরোধী দলকে দমনের উপাদান নিয়ে সেই আত্মাটি গঠিত। এরা উচিৎ-অনুচিতের ধার ধারে না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে যেকোন অনৈতিক পন্থা অবলম্বনই হচ্ছে তাদের অব দি রেকর্ড নির্বাচনী ইশতেহার। আমি বিএনপি’র পক্ষ থেকে মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুরের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং সরকারকে এধরণের গর্হিত কর্মকান্ড থেকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সহ দপ্তর সম্পাদক মোঃ মনির হোসেন, সহ প্রচার সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন, নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম পটু প্রমুখ।