জাহিদুর রহমান তারিক,ঝিনাইদহঃ
গত তিন বছরে ঝিনাইদহ জেলার ১৩৯ জন অভিবাসির স্বপ্ন আন্দামান সাগরে ভেসে গেছে। ভিটে বাড়ি বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন তাদের কাছে এখন কেবলই দুঃস্বপ্ন। আন্দামান সাগরে ভাসা এ সব অভিবাসিরা জীবন বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরলেও তাদের শেষ সম্বল আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। তাদেরই একজন শৈলকুপা উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মনোয়ার হোসেন। তিনি শৈলকুপার পার্বতিপুর গ্রামের সুজন নামে এক দালালের খপ্পরে পড়ে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। সুজন দালালকে দেওয়া হয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার সঙ্গী ছিলেন শৈলকুপার পিয়াস ও তরিকুলসহ আরো আট’শ জন। চট্রগ্রাম থেকে প্রথমে মায়ানমার ও পরে সাগর ডনদের সহায়তায় মালয়েশিয়ার এক পাহাড়ে ঠাঁই হয় তাদের। সেখান থেকেই তারা ধরাপড়ে ৬ মাস জেলের ঘাটি টেনে বাড়ি ফেরেন নি:স্ব হয়ে। সাগরে ভাসা দু:সহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে মনোয়ার হোসেন আরো জানান, আন্দামান সাগরে অষ্ট্রেলিয়াগামী এক গরু বাহী জাহাজে তাদের তুলে দেওয়া হয়। সাগরের মাঝপথে তেল ফুরিয়ে যায় জাহাজের। দালালরা সেই অবস্থায় তাদের রেখে স্প্রিড বোর্ডে পালিয়ে যায়। একটি মাছ ধরা জাহাজের কাছ থেকে তেল নিয়ে তারা পৌছায় মালয়েশিয়ার একটি পাহাড়ে।

শৈলকুপার হাটফাজিলপুর গ্রামের সফি বিশ্বাসের ছেলে দলিল উদ্দীনও বর্ণনা করলেন সাগরে ভাসা দুঃস্বপ্নের কথা। তিনি ৩ মাস ধরে আন্দামান সাগরে ভেসে বেড়িয়েছেন। তার সঙ্গী ছিলেন শৈলকুপার সোহান ও মহসিনসহ প্রায় তিনশ অভিবাসি। এর পর মায়ানমারের জেলে ২৩ দিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরেন। তিনি হাটফাজিলপুরের সুমন দালালকে মাত্র ৮৬ হাজার টাকা দিয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। ঝিনাইদহ শহরের চরমুরারীদহ গ্রামের মতলেব মন্ডলের ছেলে রফিকুল ইসলাম বিনা টাকায় সাগর পথে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন। রফিকুল ও একই গ্রামের আবুল কালাম তিন মাস ধরে সাগরে নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাদের জিম্মি করে ৮০ হাজার টাকা আদায় করে বাড়ি ফেরৎ পাঠানো হয়। মুরারীদহ গ্রামের লিটু দালাল রফিকুল ও কালামকে নিয়ে যান। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পরানপুর গ্রামের রুহুল আমিন উজ্জলও জানালেন আন্দামান সাগরে ভেসে বেড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা। ঝিনাইদহ এইড ফাউন্ডেশন মিলনায়নে মঙ্গলবার জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে এক কর্মশালায় নিরাপদ অভিবাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক অনুষ্ঠানে এ সব অসহায় অভিবাসিদের বিষয়ে তথ্য প্রদান করা হয়।

আন্দামান সাগর থেকে ফেরৎ আসা অভিবাসি ও তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিক ভাবে পুনর্বাসন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দীন বিশ্বাস জানান, তারা প্রাথমিক ভাবে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও শৈলকুপার ৭৫ জন অভিবাসিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রল্পের পরিসর বাড়লে বাকীদের অর্ন্তভুক্ত করা হবে। এছাড়া সমষ্টিগত ভাবে অভিবাসিদের আর্থিক সহায়তার জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের সহকারী পরিচালক দোয়া বখস্ শেখ জানান, অভিবাসিদের পুর্নবাসনের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে ও পারিবারিক ভাবেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে যাতে তারা দুঃস্বপ্ন ভুলে থাকতে পারে। কর্মশালায় সাংবাদিকদের পরিসংখ্যান দিয়ে জানানো হয়, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই ১১ বছরে ঝিনাইদহ জেলা থেকে বিভিন্ন দেশে ৫৫ হাজার ৩৪৭ জন কাজের সন্ধানে গেছে। এদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষর হার খুবই কম। অভিবাসিদের মধ্যে ৮০% জনের রয়েছে সাক্ষর জ্ঞান। ১৫% অভিবাসি ক্লাস ওয়ান থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত পড়া রেখা করেছেন। বাকী ৫% ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত পড়েছেন। দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা দিনমজুর হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন বলেও পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়।