ঢাকা, ২৯ এপ্রিল ২০১৮: দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি হিসেবে দুর্যোগ ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশে দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা ৩০টি অধিকার ভিত্তিক নাগরিক সংগঠন, এনজিও এবং নেটওয়ার্ক। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের স্মরণে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে ২০১৬ সালে মানবিক কর্মকান্ড বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সম্মেলনের ফলাফল এর আলোকে দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতিসংঘ সংস্থা ও আইএনজিওদের সরাসরি প্রকল্প পরিচালনা থেকে সরে আসার এবং এক্ষেত্রে স্থানীয় এনজিওদের নেতৃত্ব¡ প্রদানে সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানানো হয়।
‘‘ভয়াল ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ স্মরণ : দুর্যোগ ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ’’ শীর্ষক এই মানববন্ধনটি যৌথভাবে আয়োজন করে অনলাইন নলেজ সোসাইটি, অর্পণ, আলোক যাত্রা, উদ্দীপন, উদয়ন বাংলাদেশ, উন্নয়ন ধারা ট্রাস্ট, এসডিও, কোস্ট ট্রাস্ট, জাতীয় কৃষাণী শ্রমিক সমিতি, জাতীয় শ্রমিক জোট, ডিজাস্টার ফোরাম, ডাক দিয়ে যাই, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা, পিএসআই,পল্লী-বাংলা উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতি, বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশন, বিডিপিসি, মুক্তির ডাক, লেবার রিসোর্স সেন্টার, সংগ্রাম, সিডিপি, সংকল্প ট্রাস্ট, নেচার ক্যাম্পেইন, নাহাব, নিরাপদ, প্রান্তজন ও ড্যাকোপ।
কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন একই সংস্থার সহকারী পরিচালক শওকত আলী টুটুল। আরও বক্তব্য রাখেন অর্পনের আব্দুল কাদের হাজারী, বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতির সুবল সরকার, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের জায়েদ ইকবাল খান, ডিজাস্টার ফোরামের তাজুল ইসলাম এবং বিডিডিপিসির লাইলা কবির।
শওকত আলী টুটুল বলেন, দেশে এখনো দুর্যোগ এবং জলবায়ু সহনশীল তেমন কোন অবকাঠামো তৈরি হয়নি। একটি দেশের উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির জন্য মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ, সেতু, ফ্লাইওভার, চারলেনে রাস্তা, বহুতল ভবন, এক্সপ্রেসওয়ে অবশ্যই দরকার আছে, কিন্তু দুর্যোগ প্রবণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত একটি দেশের জন্য দুর্যোগ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আব্দুল কাদের হাজারী বলেন, প্রলয়ংকারী এই ধ্বংসযজ্ঞের ২৭ বছর পার হলেও এখনো স্বজন হারাদের আর্তনাদ থামেনি, বরং বাড়ছে আতংক। ক্ষতি না কাটতেই উপকূলে সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু, নাডা ও কোমেন নামক সাইক্লোন একের পর এক আঘাত হানছে উপকূলে। দিশেহারা উপকূলের জনগন, নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে মোকাবেলা করছে এগুলোর। তিনি চরের মানুষের উপযোগী জীবিকায়ন কর্মকান্ডে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর দাবী করেন।
জায়েদ ইকবাল খান বলেন ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ২৭ বছর অতিবাহিত হলেও উপকূলীয় মানুষের সুরক্ষায় নেয়া হয়নি কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ভোলা, মনপুরাসহ দ্বীপের চারপাশে অরক্ষিত হয়ে আছে অনেক বেড়ীবাঁধ। প্রতি বছর জোয়ার ও বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় দ্বীপের শতশত একর জমির ফসল। সাগরে লঘুচাপ, নি¤œচাপ কিংবা মেঘ দেখলেই আতঙ্কে চমকে উঠেন উপকূলবাসী। তিনি উপকূলীয় এলাকায় লোনা পানির অনুপ্রবেশ রোধ এবং মিঠা পানির বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবী জানান।
বিডিপিসির লাইলা কবির বলেন পাহাড়ী এলাকাসহ সারা দেশে এখন ভূগর্ভস্ত পানির লেয়ার নিচে নেমে গেছে। ভুগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে ভূউপরিস্থ পানির সঞ্চয় বৃদ্ধি এখনই গ্রহণ করা না হলে অদুর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভয়াবহ পানি সংকটে পড়বে। তিনি চর এবং উপকূলীয় এলাকায় বেশী সংখ্যক কমিউনিটি রেডিও অনুমোদন দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান যাতে অতি সহজে আবহাওয়া সংবাদ ও বিপদ সংকেত মানুষের নিকট পৌছানো যায়।
ডিজাস্টার ফোরামের তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন প্রায় প্রতিবছরই সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে নৌকা ডুবে যায় এবং অনেক জেলে নিখোঁজ হয়। উপকূল জুড়ে এমন নিস্বঃপরিবার অনেক পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক ভাবে এসব নৌকা ও জেলেদের নিবন্ধন না থাকার কারণে জেলে পরিবারগুলি কোন ধরনের সরকারী সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি নৌকার মালিক নিখোজ জেলেদের কোন দায় দায়িত্ব নিতে চায় না। তিনি উপজেলা প্রশাসনকে কর্তৃত্ব দিয়ে জেলে নৌকার রেজিস্ট্রেসন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোড় দাবী জানান।
সঞ্চালক মোস্তফা কামাল তার সমাপনী বক্তৃতায় জাতিসংঘ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো দুর্যোগ মোকাবেলায় সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘ সংস্থাসমূহ ও আইএনজিওদের ২০১৬ আন্তর্জাতিক মানবিক কর্মখান্ড বিষয়ক (ডঐঝ) সম্মেলনের গ্রেন্ড বারগেইনে তাদের নিজেদের দেয়া প্র্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে।