রাজধানীর মগবাজারের নয়াটোলা এলাকায় থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মমিন। ফার্মগেটে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। অফিসে যেতে সকাল ১০টার দিকে চারতলা বাসার নিচে নেমে দেখেন সড়কে হাঁটুপানি। সড়কে পানি ওঠার কারণে বাসও কম। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর তিনি একটি রিকশা পান। রিকশাচলক ফার্মগেটের ভাড়া চেয়ে বসেন ১০০ টাকা। বাধ্য হয়ে তিনি ওই রিকশায় অফিসে আসেন। তাঁর মতো আরও অনেক ব্যক্তিকে বৃষ্টির কারণে আজ শনিবার চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বসুন্ধরা সিটির পেছনের রাস্তায় কোমরসমান পানি। এখানে পানি পারাপারের জন্য ভ্যান ও রিকশার সহায়তা নিতে দেখা গেছে। পানি পারাপারের জন্য রিকশা ও ভ্যানচালকেরা হাঁকডাক দিচ্ছেন। ১০ টাকার বিনিময়ে পানি পারাপার হচ্ছেন এই এলাকার মানুষ।

গ্রিন রোডে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনেও একই দৃশ্য। এমনিতেই সেই রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কম, এই সুযোগে রিকশাচালকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী মো. হাসান বলেন, গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনে থেকে ফার্মগেট যেতে চাইলে এক রিকশাচালক ১০০ টাকা ভাড়া চান। অথচ এমনি সময় এই ভাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকার বেশি নয়।

বেসরকারি এক সংবাদমাধ্যমের সংবাদকর্মী কাবেরী মৈত্রেয় ফেসবুকে বাসার নিচের পানি ওঠার ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘বাসার নিচে কোমর পর্যন্ত জল…! চারতলা বাসার নিচতলা এরই মধ্যে ডুবেছে। এর ওপর এখনো বৃষ্টি থামার নাম নাই…! অফিসে যাব কীভাবে, তা ভাবতে ভাবতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর..!’

তিন দিন ধরে টানা বর্ষণে ঢাকার জনজীবন বিপর্যস্ত। গতকাল শুক্রবারই বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানিতে রাস্তা তলিয়ে যায়। রাতভর বৃষ্টি হওয়ায় আজও অনেক সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ। বিশেষ করে সমস্যায় পড়ে স্কুলগামী শিশুরা। কর্মস্থলের যাওয়ার পথে যানবাহনের অভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখা যায় অনেককে।

রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। সড়কে যানবাহন চলাচলও থমকে গিয়ে ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। সকালে আকাশে কালো মেঘ ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দেখেও যাঁরা বাইরে বের হয়েছিলেন, তাঁদের বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। তিন দিনের বৃষ্টির পানি রাজধানীর সড়ক-অলিগলিতে জমেছে। তবে আজ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি কম।

রাজধানীর মিরপুর, গ্রিন রোড, বসুন্ধরা সিটির পেছনের রাস্তা, তেজকুনি পাড়া, তেজতুরী বাজার, খিলগাঁও, গোড়ান, বাসাবো, নয়াপল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজারের ভেতরের দিকে গলি, ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার এলাকার অধিকাংশ সড়কই পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরপানি জমে রয়েছে। বৃষ্টি চলতে থাকায় জমা পানির পরিমাণ বাড়ছেই।

মিরপুরের ১১ নম্বর কালশী রোড, কাজীপাড়া, সেনপাড়া, ১৩ নম্বর সেকশন এগুলোর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে গেছে। মিরপুর ৬ নম্বরের একাংশ, ১০ নম্বর গোলচত্বরের সড়কের একাংশও পানিতে ডুবে গেছে।

শিশুসন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে এক অভিভাবক বলেন, আজ বাচ্চার স্কুলে পরীক্ষা। তাই যেতে হয়েছে। নিজের মোটরসাইকেল থাকায় পরিবহন খোঁজার ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। এমনিতেই বৃষ্টি, তার ওপর রাস্তায় পানি জমে থাকায় বেশ অসুবিধা হয়েছে।

মিরপুর ১ নম্বর ছাপাখানার মোড় থেকে আনসার ক্যাম্প বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন অনেকে। বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় অনেককেই ভ্যানে করে যাতায়াত করতে দেখা যায়।

রাস্তার বাসিন্দা রুমা আহমেদ জানান, বাসার সামনে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যাওয়া অফিস যেতে পারেননি আজ। বাসার সামনেও দাঁড়ানোর উপায় নেই। আধা ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে কোনো পরিবহন না পেয়ে বাসায় ফিরে গেছেন তিনি।

খিলগাঁও থেকে সকালে অফিসের উদ্দেশে বের হন আফসানা। তিনি বলেন, বাসার সামনে মূল ফটকের সামনেই পানি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো রিকশা পাওয়া গেল না। খোলা নর্দমার কারণে নোংরা পানি পার হয়েই অফিসের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। ভাড়াও গুনতে হয়েছে অন্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। অফিসে পৌঁছেছেন ভিজে।

ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (পশ্চিম) লিটন বলেন, নগরে তিন দিন ধরে বৃষ্টি। তবে নগরবাসী তেমন বের হচ্ছে না। বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি জমেছে, তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় যানজট হয়নি। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ তেমন বাইরে বের হচ্ছে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নিম্নচাপের প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আজও বৃষ্টি হবে। কোথাও থেমে থেমে, কোথাও টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হবে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজারে আজও ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। নৌবন্দরগুলোকে ২ নম্বর সতর্কতাসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে আজ সকাল ছয়টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল সকাল ছয়টা থেকে আজ সকাল ছয়টা পর্যন্ত—এই ২৪ ঘণ্টায় কেবল বৃষ্টি হয়েছে ১৪৯ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি এখন পর্যন্ত স্থল নিম্নচাপ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে আজ সারা দিনই বৃষ্টি হবে। কোথাও থেমে থেমে, কোথাও টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হবে। আগামীকাল রোববার থেকে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের সম্ভাবনা রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে খুলনায় ১৬৩, বরিশালে ১৮৬, রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ১০০, চট্টগ্রামে ১০, সিলেটে ৮ ও রংপুরে ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় গোপালগঞ্জে। এখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৭১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

টার্মিনালে বাস চলাচল ব্যাহত: টানা বৃষ্টির কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বড় এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীতে। সকালে গাবতলীতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী বাসের অপেক্ষা করছেন। কয়েকটি বাসের কাউন্টারে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া যানজটের কারণে বাস সময়মতো কাউন্টারে এসে পৌঁছায়নি। রাজশাহীগামী ন্যাশনাল বাস কাউন্টারে বসে ছিলেন ফজলে রাব্বী। তিনি জানান, বেলা একটার বাসের জন্য তিনি এসে দেখেন বাস আসেনি। কাউন্টার থেকেও সঠিক নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনার (গাবতলী) সাইফুল আলম বলেন, গাবতলী থেকে দক্ষিণবঙ্গের যেসব বাস আছে, সেগুলো ছাড়ছে না। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফেরি বন্ধ রয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গতকাল ভোর থেকে সৃষ্ট যানজট আজ সকালেও রয়েছে। মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে মির্জাপুরের সোহাগপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকায় এবং টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে করটিয়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার যানজট। চন্দ্রা থেকে নবীনগর সড়কের আট কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট রয়েছে। চন্দ্রা থেকে গাজীপুর রাস্তাতেও তিন কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে কালিয়াকৈর-নবীনগর সড়কের বিভিন্ন জায়গায় এমনিতেই গর্ত। বৃষ্টিতে এসব গর্তে জমেছে পানি। একই সঙ্গে চলছে চার লেন তৈরির খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। এতে গতকাল ভোররাত থেকে শুরু হয় যানজট। রাস্তা পার হতে সময় লাগছে দ্বিগুণেরও বেশি।

কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হোসেন সরকার জানান, বৃষ্টির কারণে রাস্তার খানাখন্দে পানি জমেছে। এতে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। এ কারণে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল ব্যাহত: টানা বৃষ্টিতে সারা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত চলাচলকারী বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অনেকগুলো গন্তব্যে বিমান যে সময় ছাড়ার কথা, তা ছাড়েনি। কক্সবাজার থেকে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল জানান, বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজে গতকাল ৪টা ৫০ মিনিটে তাঁর ঢাকা আসার কথা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ তা বাতিল করে। পরে আজ সকাল সাড়ে নয়টায় ছাড়ার কথা থাকলেও বিমান ছেড়েছে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে।