শাহারিয়া শাহাদাৎ,রিপোর্টর:-চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলার প্রায় ৮৭০ পরিবার বন্যা কবলিত হয়েছে। ফলে গ্রামের উঁচু আম বাগানে ও পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। থাকতে হচ্ছে পলিথিনের তাঁবু খাটিয়ে। রান্না-বান্না চলছে খোলা আকাশের নিচে। বন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর উপজেলায় নদীতীরবর্তী নি¤œাঞ্চলে বসবাসরত পরিবারগুলো পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে বন্যায় প্রায় তিন হাজার ৭০০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে সোমবার থেকে ৮৭০টি পরিবারের কাছে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানোর আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হাসান।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলায় বন্যা কবলিত ৮৭০টি পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। সোমবার থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ত্রাণ হিসেবে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতেই পূনর্ভবা নদীর পানি ও শনিবার রাতে মহানন্দা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এ দুটি নদীর তীরবর্তী নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রোববার বিকেলে ধারণকৃত রেকর্ডমতে গোমস্তাপুর উপজেলায় পূনর্ভবা নদীর পানি বিপদ সীমার ৭০ সেন্টিমিটার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে রোববার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামই পানিতে নিমজ্জিত। সেখানকার একটি আম বাগানে আলমপুর বালুচরের বানভাসি অন্তত শতাধিক পরিবার পলিথিনের ছাউনী তুলে কোন রকমে বাস করছে। খোলা আকাশের নিচে গরু ছাগল নিয়ে বসবাস করা মানুষগুলোর চিন্তা, যদি আরো পানি বৃদ্ধি পায় তবে এই বাগানে পানি উঠবে তখন তারা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিবে। সবচেয়ে বেশি চিন্তা খাবার নিয়ে। এ কদিন থেকেই আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে তাঁদের।
আলমপুরের বালুচর এলাকার বেশ কিছু পরিবার দলদলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দলদলী উচচ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়ে আছে। আনিরুল ইসলাম নামে একজন জানান, তাঁরা গত ৭ দিন আগে ঘর ছেড়ে অনেক কষ্টে এখানে আছেন। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোন সহায়তা পাননি বলে জানান তাঁরা।
তবে গত শনিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ইউপি চেয়ারম্যান তাঁদের অবস্থা দেখে গেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তাঁরা।
অন্যদিকে আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, এ বিদ্যালয়ে গত ৬ দিন থেকে আশ্রয় নিয়েছে চরআলমপুরের ২৪টি পরিবার। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের এখানে কোন সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কেউ আসেনি।
এছাড়া ভোলাহাট উপজেলার দলদলি উচ্চ বিদ্যালয় ও দলদলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, এ দুটি বিদ্যালয়ে বন্যা কবলিত ৪২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গিয়ে জানা যায়, এ গ্রামের আরো ২৫টি পরিবার বিভিন্ন স্থানে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
ফেরার পথে বিকেলে গোমস্তাপুর উপজেলার কানচনতলা এলাকায় দেখা যায়, একটি বড় কালভাটের নিচে বাঁধ দেওয়ার জন্য কাজ করছে গ্রামের লোকজন। সেখানে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ কালভার্টের ওপারেই রয়েছে কয়েক হাজার বিঘা জমির কলা বাগান, ধান ও বিলের মাছ। মহানন্দা নদীর পানি এ কালভাটের নিচ দিয়ে ঢোকার আশংকা থেকেই এ বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এখান থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে নদীর পানি ঠেকানোর জন্য তাঁরা প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ দিয়েছে কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ায় তাঁরা কালভাটের নিচেও বাঁধ দিচ্ছে।
এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিহাব রায়হান জানান, বোয়ালিয়া ইউনিয়নের মহানন্দা নদীর চর এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকায় এতে ৮০টি পরিবার বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। গবাদিপশুসহ তাঁরা ইউনিয়নের উঁচু আম বাগানগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সোনাতলা বাঁধ পূনর্ভবা নদীর পানির চাপে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বাঁধের অপর পাড়ে পানির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে বাঙ্গাবাড়ি ও আলিনগর ইউনিয়ন পুরোপুরি বন্যা কবলিত হয়ে পড়বে। বাঁধটি রক্ষার জন্য ৩০০ জন শ্রমিক কাজ করছে। এছাড়া চৌডালা ইউনিয়নের চৌডালা সেতুর কাছে চর উদয়নগর এলাকা মহানন্দা নদীর পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এখানকার ৩০টি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে ত্রাণ চেয়ে পাঠানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ