গত কয়েক বছরের মতো এ বছরও গুম আতঙ্ক পিছু ছাড়েনি। শুরুর দিকে আতঙ্কে ছিলেন চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। ক্রমে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সেই ভীতি ছড়ায়। এ বছরের শেষ ভাগে এসে গুমের তালিকায় যুক্ত হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, রাষ্ট্রদূত, চিকিৎসক, শিক্ষক ও সাংবাদিকের নাম।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গুমের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৭৫ জন। তাঁদের মধ্যে পরে ৩৫ জনের হদিস পাওয়া যায়, উদ্ধার হয় ৭ জনের মৃতদেহ। এখনো নিখোঁজ ৩৩ জন। যে ৩৫ জনের হদিস পাওয়া গেছে তাঁদের মধ্যে আবার কমপক্ষে ১৬ জনকে পরে আদালতে উপস্থাপন করেছে পুলিশ বা র‍্যাব। আদালতকে বলা হয়েছে, এক দিন আগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতিটি ঘটনায় স্বজনেরা গুমের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অভিন্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ‘অজ্ঞাত অপহরণকারীরা’ তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবারগুলো। আত্মীয়স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বা অপহরণের মামলা করেছেন। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবগুলো শাখায় ধরনা দিয়েছেন। গিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোয়। সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

গুম হওয়ার পরপর পুলিশ-র‍্যাব ‘দেখছি’, ‘খুঁজছি’, ‘আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি’ এমন শব্দ ব্যবহার করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। একসময় সব পক্ষের উদ্যোগ থিতিয়ে গেছে। পরিবারগুলো ব্যক্তিগতভাবে স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষা করেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে যাঁরা গুম হয়েছিলেন, তাঁদের স্বজনেরা এ বছর কমপক্ষে তিনটি সমাবেশ করেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ওই সমাবেশগুলোর খবর ফলাও করে প্রচার হয়েছে।

ফিরে আসা দুজন অপহরণকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, তাঁরা পেশাদার। জামালপুরের সরিষাবাড়ির মেয়র রুকনুজ্জামান রুকন ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় দুজনেরই মত ছিল এমন। রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান নিখোঁজের ঘটনায় তাঁর মেয়েরাও এ কথা বলেছেন। ছোট মেয়েকে বিমানবন্দর থেকে আনতে যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। তাঁর গাড়িটি পাওয়া যায় ‘তিন শ ফুট’ নামক সড়কের ওপর। বাসা থেকে যাঁরা মারুফ জামানের ল্যাপটপ, সিপিইউ ও স্মার্টফোন নিয়ে যান, তাঁরা সিসিটিভি ক্যামেরা এড়ানোর কৌশল খুব ভালোভাবে জানেন বলেও জানায় মারুফ জামানের পরিবার। কিন্তু এই ‘পেশাদার অপহরণকারী’ কারা, সে সম্পর্কে কখনোই কিছু জানা যায়নি।

এ বছরের জুলাই মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘উই ডোন্ট হ্যাভ হিম: সিক্রেট ডিটেনশনস অ্যান্ড এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো তথ্য-প্রমাণসমৃদ্ধ, কিন্তু তারপরও সরকার আইনের শাসনের দিকে না তাকিয়ে ঘৃণিত এ কাজটি করে চলেছে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বরাবর অভিযোগ অস্বীকার করে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, যাঁদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তাঁরা নানা কারণে স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন। অবশ্য বছরের শেষার্ধে নিখোঁজদের ফিরে আসার পর তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণেই তাঁদের ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

তবে বছর শেষে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ এবং পরে ফিরে আসা সাংবাদিক উৎপল দাস ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসানের পরিবার বলেছে, মুক্তিপণের জন্য তাঁদের অপহরণ করা হয়েছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় বলেছেন, তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার তাঁকে অপহরণ করিয়েছেন। যদিও আগে পরিবারগুলো মুক্তিপণের বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু বলেনি।

বলতে গেলে কেউই তাঁদের অজ্ঞাতবাস সম্পর্কে মুখ খোলেননি। তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে যথাসম্ভব এড়িয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মত প্রকাশে ছিলেন সাবধানী। স্বামী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া ও ফেরার তিন বছর পর এ বছরের আগস্টে একটি সেমিনারে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘যদি একটা অপহরণের ঘটনাই হতো শেষ অপহরণের ঘটনা, তাহলে অবশ্যই যাঁরা অপহৃত হয়েছেন, তাঁরা এবং তাঁদের পরিবার কথা বলতেন। একটা অপহরণের ঘটনা সারতে না সারতেই যদি দেখেন ৭ জন অপহরণ হয়েছেন, তা-ও আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে এবং এমন পর্যায় থেকে, যাকে আপনি ফেলে দিতে পারবেন না…এটা তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কালচারের ভেতরে ঢুকে গেছে।’