গত ১২ই জানুয়ারী ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন,…“ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার নির্বাচনের সময় সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।”…

সবাই জানে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন কমিশন মারফত। তাই নির্বাচন প্রাসঙ্গিকতায় ‘নিরপেক্ষতা’র প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য বা সক্ষমতার সাথে নির্বাচন কমিশনই জড়িয়ে থাকে। কিন্তু নির্বাচন প্রসঙ্গে আস্থার ঘাটতি পূরণে তথা নিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রসঙ্গে খোদ একটি সরকার গঠনের মতো বিষয়ের অবতারণা এবং এটা শুধু প্রধানমন্ত্রী নয় বিরোধী দল সহ ব্যাপক জনমনে গ্রহণযোগ্যতার নিক্তি হয়ে উঠছে; এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রসঙ্গ এলেও নির্বাচনকালীন সরকারের ঘোষণা দেয়ার পরই কেবল তা উল্লেখ করতে হচ্ছে। আর এটা করতে গিয়ে সংবিধানে না থাকলেও সেই সংবিধানের দোহাই দিতে হচ্ছে বা সংবিধানই প্রসঙ্গ হয়ে উঠছে!

দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী দলসহ ব্যাপক জনমনে এ বিষয়টা ঘটতে পারছে কিভাবে?

৯০ পরবর্তী, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই মূখ্যতঃ এদেশের ব্যাপক মানুষের নাগরিক বোধে গেঁথে গেছেÑ ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন নয়, সরকারই প্রসঙ্গ তথা সরকারের তত্ত্বাবধানগত দায়িত্বেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে, সরকার ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক তুলনায় যা হয়Ñ যথারীতি তাই হচ্ছে অর্থাৎ নির্বাচন প্রাসঙ্গিকতায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন অগৌণ হয়ে পড়েছে। যদিও আদালতের রায়ে সে সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে তবুও কমিশন যেমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সরকার প্রাসঙ্গিকতায় অগৌণ তেমনি আদালতও রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকার প্রাসঙ্গিকতায় অগৌণ হয়ে যেতে বাধ্য।

অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাপক জনগণের কাছে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের শর্তে সেই ‘নির্দলীয় তথা প্রাতিষ্ঠানিক সরকার’ এর ধারণাটাই রয়ে গেছে এবং নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকট নিরসনে যতক্ষণ না পর্যন্ত ‘নির্দলীয়’ অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এর নিরসন ঘটবে না এবং যথারীতি সংশ্লিষ্ট অপরাপর প্রতিষ্ঠানকেও ভারসাম্যহীন করে তুলবে; নির্বাচন কমিশন বা আদালতের মর্যাদার ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছে।

কিন্তু বহু দলীয় শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন সরকার কোনো না কোনো দলেরই হয়ে থাকে। আর সেই সরকার নিজেকে যতই নিরপেক্ষ আর নির্দলীয় সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান না কেনো তাঁর সে স্বদিচ্ছা ও সততা ততোধিক শঠতাপূর্ণ ভাবমূর্তিতেই দেশবাসীর সামনে উপস্থাপিত হতে থাকে। কারণ, দল করে দলীয় সরকার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সেই সরকারী জোরে কেবল ঘোষণা দিয়েই নিজেকে রাতারাতি ‘নির্দলীয়’ ভাবমূর্তিতে স্থাপন করা যায় না। এ জন্যেই এই প্রসঙ্গ এবং প্রচেষ্টা ¯্রফে লেজে-গোবরে অবস্থা!

সেক্ষেত্রে উক্ত ‘নির্দলীয়তা’র শর্ত মূলতঃ সরকারের প্রভাব মুক্ত তথা ক্ষমতাসীন ‘দল নিরপেক্ষতা’র শর্তকেই বুঝায় এবং অনিবার্যভাবেই তা ‘সর্বদলীয়’তার বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে।
আর সকল দলের সম্মিলিত রূপকে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য’ বা সর্বদলীয় ফ্রন্ট হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়।

সেক্ষেত্রে, দল নিরপেক্ষতার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য সঞ্জাত অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকারের শর্ত পূরণে জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য কিভাবে সম্ভবÑ যেখানে শুধু সরকার ও বিরোধী দল নয় বরং সকল রাজনৈতিক দলেরই সংশ্লিষ্টতা থাকবে।

আর সেই সর্বদলীয় ঐক্যের সাংবিধানিক বা কাঠামোগত রূপ দেয়ার মধ্যে দিয়েই কেবল অনাস্থ্ার সংকট নিরসনে দল নিরপেক্ষ সরকার তথা রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য সঞ্জাত অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার আসতে পারে।

প্রস্তাবিতÑ অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন প্রসঙ্গে নিবন্ধন শর্ত এবং সংসদ

সংসদে সব দল থাকে না বা নির্বাচনে অংশ নেয় না অথবা নির্বাচিতও হতে পারে না অথচ জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য বলতে সব দল নিয়ে গঠিত হওয়াকেই বোঝায়। তাছাড়া সংসদে সরকার ও বিরোধী দল তথা বিধিবদ্ধতায় পক্ষ-বিপক্ষের বৈশিষ্ট্যকে বহন করে। অর্থাৎ ‘সর্বদল’ এবং সংসদীয় বৈশিষ্ট্যের মানদ-েই ঐক্যের শর্তকে প্রতিফলিত করতে পারে না বিধায় জাতীয় ঐক্যের মানদ-ে জাতীয় সংসদ নির্দিষ্ট হতে পারে না।

আর তাই এক্ষেত্রে দল বলতে কোন রাজনৈতিক দলসমূহ এবং কোন মানদ- বা নিক্তিতে তা নির্দিষ্ট হবে? সর্বাগ্রে সে প্রশ্নের মীমাংসাই জরুরী হয়ে পড়ে। অর্থাৎ জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্রে দল নির্দিষ্টকরণে ‘জাতীয় নিক্তি’ অনিবার্য। তাছাড়া আস্থার সংকট নিরসনে বিগত প্রাতিষ্ঠানিক সরকারের শুন্যতা পূরণেই মূখ্যত নির্বাচনকালীন সরকারের প্রাসঙ্গিকতা উঠে এসেছে বিধায়Ñ

প্রথমতঃ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংসদ ও সরকার তথা কর্তৃত্বগত দায়িত্ব নির্দিষ্ট হয় নির্বাচন মারফত। তাই এক্ষেত্রে নির্বাচনই রাজনৈতিক দলসমূহের জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকাগত প্রাসঙ্গিকতায় প্রধান দিক হয়ে ওঠে আর সংবিধান যেহেতু রাষ্ট্র তথা জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক নিক্তি হিসেবে নির্দিষ্ট থাকে সেহেতু ‘জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মানদ- তথা নিবন্ধন-এর শতর্’ই রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘জাতীয় মানে’ গৃহীত হয়। ফলে, সব রাজনৈতিক দল বলতে ‘প্রাতিষ্ঠানিক মানদন্ডে’ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহকেই বুঝায়। অর্থাৎ রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গৃহীত ‘জাতীয় নিক্তি’ তথা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান হয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সীমানায় নিবন্ধন শর্তে যে প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট হয় তা হলোÑ নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে, সংসদে কোনও দল থাক না-থাক, নির্বাচিত হোক না-হোক নিবন্ধনগত শর্তে নিবন্ধিত সব দলই কমিশনের বিধি বহন করে তাই যুগপৎ তা একমাত্র সাংবিধানিক পথ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়।

দ্বিতীয়তঃ নির্বাচন মারফত যাবতীয় কর্তৃত্বগত দায়িত্বেÑ সংসদ সদস্য ও সরকার (বিধি সংশ্লিষ্টতা) এবং সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতিভূ অর্থে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রপতির (রাষ্ট্র কাঠামো সংশ্লিষ্টতা) নির্বাচন সংক্রান্ত তত্ত্বাবধান হয় যে কাঠামোগত মাধ্যম দ্বারাÑ তা হলো ‘নির্বাচন কমিশন’। আর নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় কর্ম সম্পাদনের শর্তেইÑ বহুদলীয় বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ‘জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য (জবষধঃরড়হ)’ তথা রাজনৈতিক দল ও তার পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরে কোনো সংকট সমাধান তথা জাতীয় রাজনীতি প্রাসঙ্গিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ‘প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বে’ নির্বাচন কমিশনই প্রণিধান যোগ্য হয়ে ওঠে।
তৃতীয়তঃ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচন সংক্রান্ত আইন বা বিধি-বিধান প্রণয়ন করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কিন্তু নিবন্ধনগত শর্তে ইতোমধ্যে সে ক্ষমতা রাজনৈতিক দলসমূহের প্রসঙ্গেও প্রযুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এখন আর কেবল নির্বাচন সংক্রান্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ নয় বরং রাজনৈতিক দলসমূহেরও (রাজনৈতিক দল ও তার পারস্পরিক সম্পর্ক) প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার অনিবার্যতায় নির্বাচন কমিশনই প্রাসঙ্গিক।

উপরোল্লিখিত তিনটি কারণেই প্রধানতঃ সংসদ নয় বরং নিবন্ধন শর্তই এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য এবং কমিশন হয়ে সংবিধানসম্মত উপায় বলতেও নিবন্ধিত দলসমূহই সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে গত ২৪শে আগস্ট ২০১৭ খ্রিঃ তারিখে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ‘জাতীয় পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল মুক্তিজোটÑ যেখানে সরকার ও বিরোধী দলসহ নিবন্ধিত ৪০টি দলই এক টেবিলে থাকবে।

জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত উক্ত জাতীয় পরিষদ তথা ‘সমন্বিত সভা’ই জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রিক আস্থার সংকট নিরসনে ‘অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার’Ñএর ভূমিকায় নির্দিষ্ট থাকবে; যুগপৎ যা দল নিরপেক্ষ তথা সর্বদলীয় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যে সংবিধান সম্মত একমাত্র পথ হিসেবে সুনির্দিষ্ট রূপরেখায় প্রস্তাবিত থাকছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে (কনফারেন্স লাউঞ্জে) ২৩শে জানুয়ারী, সকাল ১১:৩০ টায় মুক্তিজোট কর্তৃক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠন প্রধান- আবু লায়েস মুন্না,জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি প্রধান- মোঃ সিরাজুল ইসলাম, কাঠামো পর্ষদ প্রধান- মাহমুদ হাসান আবেদ, জাতীয় কাঠামোগত সার্বক্ষণিক- মুহাম্মদ নাজমুল হাসান, পরিচালনা বোর্ড প্রধান- মোঃ শাহজামাল আমিরুল, কন্ট্রোল বোর্ড প্রধান- মোঃ বদরুজ্জামান রিপন, এডিটোরিয়াল বোর্ড প্রধান- এ্যাডভোকেট ক্রিস্টিও মারিও দ্য শিল্পী দাস ও বীপ্র প্রধান- একেএম শাহনেওয়াজ গণী।