উপটৌকন আর অর্থের লোভে স্বামী রেখে সাবেক প্রেমিকের কাছে বিয়ে দিতে বাবা-মা তাদের মেয়েকে শিকলে বেঁধে নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আফরিন আক্তার (২০) নামে ওই নারীকে বদ্ধ ঘরে শিকলে বেঁধে নির্যাতন করার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন আফরিনের দূর সম্পর্কের এক বোন জামাই জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার।

শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর চরকুমারিয়া সরদার কান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে বুধবার (০১ নভেম্বর) পুলিশের সহায়তায় নির্যাতিতা আফরিন আক্তারকে উদ্ধার করে ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

নির্যাতিতা আফরিন আক্তার জানিয়েছেন, আফরিনের বাবা নুরুদ্দিন ঢালী তাদের আত্মীয় জাহাঙ্গীর হোসেন সরদারের মদদেই তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করেছেন।

জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর চর কুমারিয়া সরদার কান্দি গ্রামের নুরুদ্দিন ঢালী’র মেয়ে আফরিন আক্তারের সঙ্গে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা হাওলাদার কান্দি গ্রামের তারা মিয়া সরদারের পুত্র পারভেজ মিয়ার এক বছর পূর্বে বিয়ে হয়। বিয়ের পূর্বে ভেদরগঞ্জ উপজেলার আরশি নগর ইউনিয়নের ফেলির চর গ্রামের নূরুল ইসলাস ঢালীর পুত্র মোশারফ হোসেন ঢালীর সঙ্গে আফরিন আক্তারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আফরিনের বাবা নুরুদ্দিন ঢালী তাকে মোশারফের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে তারা মিয়া সরদারের পুত্র পারভেজ মিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের পরে পারভেজ এবং আফরিনের সংসার ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে আফরিনের পূর্বের প্রেমিক মোশারফ তাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। তারই ধারাবাহিকতায় মোশারফ আফরিনের বাবাকে মোটা অংকের অর্থ ও উপটৌকন দেন এবং আফরিনকে পারভেজের সংসার হতে ফিরিয়ে এনে তার কাছে বিয়ে দিতে বলেন। এদিকে আফরিন তার স্বামী পারভেজকে নিয়ে সুখী রয়েছেন বলে জানালে তার বাবা নুরুদ্দিন ঢালী, মা ছিকরিতি বেগম এবং দুরসম্পর্কের দুলাভাই জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেন। এ কারণে আফরিন আক্তার অসুস্থ্য হয়ে পড়লে খবর পেয়ে শখিপুর থানার পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। পরে তাকে ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর চর কুমারিয়া সরদার কান্দি গ্রামের নুরুদ্দিন ঢালী’র বাড়িতে একটি অন্ধকার ঘরে আফরিন আক্তারকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তিনদিন ধরে তাকে এক গ্লাস পানিও খেতে দেয়া হয়নি। এ খবর লোক মারফত জানতে পেরে এই প্রতিবেদক সেখানে গিয়ে পুলিশকে জানালে পুলিশ এসে আফরিনকে উদ্ধার করেন। বদ্ধ ঘরে আটকের সময় তার অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে, তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। এ ব্যাপারে সখিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পরে আবার ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আফরিনের সঙ্গে এই প্রতিবেদককে কথা হয়। তখন আফরিন বলেন, প্রায় এক বছর পূর্বে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা হাওলাদার কান্দি গ্রামের তারা মিয়া সরদারের পুত্র পারভেজ মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তারা সাংসারিক জীবনে সুখী। কিন্তু তার বাবা-মা এবং তার দূরসম্পর্কের দুলাভাই জাহাঙ্গীর হোসেন তাকে তিন দিন ধরে জোর করে একটা অন্ধকার ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে নির্যাতন করেন। ওই সময় তাকে ভাত তো দূরের কথা এক গ্লাস পানিও খেতে দেয়া হয়নি। তাকে নির্মমভাবে সারা শরীরে প্রহার করা হয়েছে। তখন বেশি মারধর করেছেন তার দূর সম্পর্কের বোন জামাই জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার।

আফরিন আরও জানান, তারা আমাকে জোর করে আবার বিয়ে দিতে চায়। আমাকে স্বামীর বাড়ি যেতে দিচ্ছে না। কিন্তু আমি আমার স্বামীর বাড়ি যেতে চাই।

আফরিনের স্বামী পারভেজ মিয়া বলেন, আমার স্ত্রী আফরিনকে তার বেঁধে রেখেছে। তিন দিন আগে আমি আফরিনকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু তার আমার স্ত্রীকে দেয়নি। উল্টা আমাকে মেরেছে। আমার কাছে ব্যবসার ৫০ হাজার টাকা এবং ১৬ হাজার টাকা দামের একটা মোবাইল ফোন ছিল। সেটা ছিনিয়ে নিয়েছে। আমাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই।

আফরিনের বাবা নুরুদ্দিনের এবং মা ছিকরিতি বেগমের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, আমার মেয়ে পালিয়ে স্বামীর বাড়ি চলে যাবে তাই তাকে বেঁধে রেখেছি। তাকে আমরা অন্যত্র বিয়ে দেব।

এ ব্যাপারে শখিপুর থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হোসেনের বলেন, আফরিনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আফরিন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।